শুক্রবার, ৩ জুন, ২০১১

ক্যাম্পাস



জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্রমা
সৈয়দ আল জাবের আহমেদ

বুড়িগঙ্গা নদীর কোল ঘেঁষে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার গৌরব ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সূদীর্ঘ ১৪২ বছর ধরে জ্ঞানের জ্যোতি বিকিরণকরে চলছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রবীন বিশ্ববিদ্যালয়টি। চাতকের মত তৃষিত জ্ঞান পিপাষু মেধাবী শিার্থীদের দীপ্ত পদভারে মুখরিত শিাঙ্গনটি।থিকথিকে অন্ধকার দূরকরণে আলোর মশাল হাতে নিয়ে ছুটছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। আলোকিত বিকশিত সমাজ গঠনে স্বার রেখে যাচ্ছে। জাতীয় রাজনীতিরপ্রবল প্রভাবকের ভূমিকা রেখে আসছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ভাষা আন্দোলনে শহীদ রফিক, স্বাধীনতা যুদ্ধের নাম না জানা অসংখ্য শহীদ স্বৈরাচার বিরোধীআন্দোলনের শহীদ মোজ্জাম্মেল হক ইসলামী শাসন কায়েমের স্বপ্নরাজ সৈনিক মর্দে মুজাহিদ শহীদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সালের সুরোভিত পদধুলিতে গৌরবান্বিত বিশ্ববিদ্যালয়। সৃজনশীল মননশীল মেধাবীদের শীর্ষতম পছন্দের বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
পেছন পানে চেয়ে দেখিঃ- ১৪২ বছর পূর্বে জগন্নাথ স্কুল নামে ১৮৬৮ সালে এর পথ চলা শুরু হয়। এর পর ১৮৮৪ সালে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ নামে এররূপান্তর ঘটে। উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান কলেজে পরিণত হয় ঢাকা জগন্নাথ কলেজ। ১৮৮৭ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে স্কুল শাখা পৃথক হয়ে যায়। ১৯২০সালে ওহফরধহ ষবমরংষধঃরাব পড়ঁহপরষ ঔধমধহহধঃয পড়ষষবমব ধপঃআইন পাশ করে নথিভূক্ত করে। ১৯২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  প্রতিষ্ঠাউপলে ট্রামিষ্ট্র বোর্ডের অবসান ঘটে। এবং ১৬, ১৯২০ এর আওতায় জগন্নাথ কলেজের সমস্ত সম্পত্তি দায় দেনার ভার স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে কলেজটিতে স্নাতক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে শিার্থী ভর্তি বন্ধ হয়ে যায় এবং এটি জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ নামেপ্রতিষ্ঠা পায়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে পুনরায় স্নাতক পাঠ্যক্রম চালু হয়। ১৯৬৮ সালে জগন্নাথ কলেজ সরকারি করা হয়। ১৯৭৫ সালে এখানে সম্মান স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রম চালু হয়। পরে এটাকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তর করা হয়। ১৯৮২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্র্তি বন্ধ করা হয়। পরবর্তীতে১৯৯১-৯২ শিাবর্ষ থেকে সরকারি জগন্নাথ কলেজের কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্থানান্তর করা হয়। অবশেষেজাতীয় সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত ২০০৫ সালের ২৮নং আইনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সরকারি জগন্নাথ কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয় এবং ২০০৫সালের ২০ অক্টোবর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বর্তমান অবস্থাঃ- বিশ্ববিদ্যালয়টি  ১১.১১ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। চারটি অনুষদের মাধ্যমে আটাশটি  বিভাগে ২৪,০০০ হাজার শিার্থী অধ্যয়নরত।চারশতাধিক শিক পাঠদানে নিয়োজিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোঃ- একটি প্রশাসনিক ভবন। দুইতলা বিশিষ্ট ব্রিটিশ  আমলে নির্মিত ভবনটি ঢাকা মহানগরের ১৯৩ টি দর্শনীয় স্থাপনার একটি।এখানে ভিসি কার্যালয়, কোষাধ্য কার্যালয়, রেজিস্টার প্রক্টর অফিস এবং গণসংযোগ অফিস রয়েছে। চারটি অনুষদের রয়েছে পৃথক পৃথক  টি ভবন।সংস্কৃতি চর্চার জন্য অবকাশ ভবন নামে একটি পৃথক ভবন রয়েছে।
যে সব বিষয়ে পাঠদান করা হয়ঃ
 বিজ্ঞান অনুষদ:- পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, প্রাণীবিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞানপরিসংখ্যান, গণিত , ভূগোল পরিবেশ, মনোবিজ্ঞান, ফার্মেসী, মাইক্রোবায়োলজি কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।
ব্যবসায় শিা অনুষদঃ অ্যাকাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশনসিস্টেম, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, ফিন্যান্স ব্যাংকিং এবং মার্কেটিং বিভাগ।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদঃ- রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, নৃ-বিজ্ঞান, এবং গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগ।
কলা অনুষদবাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি, ইসলামিক স্টাডিজ, দর্শন আইন বিভাগ। উপরোক্ত চারটি অনুষদে আঠাশটিবিভাগে মোট আসন সংখ্যা রয়েছে ,৬৩৫টি।
যা কিছু আছেঃ  শিার্থীদের জন্য একটি সম্দ্ধৃ লাইব্রেরী রয়েছে। মেডিকেল সেন্টার আছে, সাংবাদিক সমিতি, সাইবার সেন্টার, আধুনিক শীততাপ নিয়ন্ত্রিতমিলনায়তন, আছে সৌর বিদ্যুগবেষণা কেন্দ্র, বিএন সিসি, রোভার স্কাউট, রেঞ্জার ইউনিট, বাঁধন ইউনিট, টি খেলার মাঠ (ধোপ খোলা) ছাত্রীদের কমনরুম একটি জামে মসজিদ। তবে যা কিছু আছে তার সবই প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত অপ্রতুল।
পরিবহন ব্যবস্থাঃ- ২৪ হাজার শিার্থীর জন্য মাত্র ৯০০ আসনের ১০টি বাস রয়েছে। শিার্থীরা দীর্ঘ দিন ধরে পরিবহন সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়েআসছে কর্তৃপ আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আবাসিক সুবিধা না থাকায় পরিবহনের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। কর্তৃপরেটনক নড়বে কিএমন জিজ্ঞাসা শিার্থীদের। শিকদের জন্য টি বাস দুইটি মাইক্রো বাস আছে যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল
আবাসিক সুবিধা নেইঃ- এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন আবাসিক সুবিধা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ টি হল বেদখল হয়ে আছে ১৯৮৬ সাল থেকে। প্রশাসন বলছেসরকারের সহযোগিতা ছাড়া বেদখল হল উদ্ধার সম্ভব নয়। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শিার্থীদের  বারবার আন্দোলনও সফলতার মুখ দেখেনি।  শিার্থীদের দাবী নতুন হল নির্মান করে আবাসিক সুবিধা প্রদানে উচ্চ শিার স্বার্থে সরকার নজরে দেবেন কি? সেই নেক নজরের প্রত্যাশায় আবাসিক সুবিধাবঞ্চিত ২৪ হাজার শিার্থী।
ছাত্র-রাজনীতিঃ- সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন এখানে সক্রিয়। ছাত্রদল ছাত্র শিবিরকে কোন কার্যক্রম চালাতে দিচ্ছে না ছাত্রলীগ। কমিটি বিহীন ছাত্রলীগচরম অন্তকোন্দলে আছে। কমিটিহীন ছাত্রলীগ বিভিন্ন গ্র উপ গ্রপে বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বেপরোয়া ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খলআচরণে ভয়ে থাকে সাধারণ শিার্থীরা। সূত্র  জানায় কাম্পাসে মোবাইল ছিনতাই  ইভটিজিং সহ নানা ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা জড়িত। পুলিশ সাংবাদিকদের মারধরের সাথে ছাত্রলীগ জড়িত। ছাত্রলীগের সংঘর্ষে হামলায় বন্ধ হয়ে গেছে জবি একমাত্র ক্যান্টিন। সবার জিজ্ঞাসা বেপরোয়া ছাত্রলীগকেরুখবে কে?
সংস্কৃতি চর্চাঃ- সংস্কৃতি চর্চা এখানে নিয়মিত। নিমন্ত্রণ সাংস্কৃতিক সংসদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, জবি আবৃত্তি সংসদ, ডিবেিিটং সোসাইটি, উদীচী এখানে সক্রিয়। গান, আবৃত্তি, বিতর্ক, নাটক, নাচ প্রভৃতি সংস্কৃতির নানা ধরনের চর্চা দেখা যায়।
প্রত্যাশাঃআছে-নেই এর মাঝে অপার সম্ভাবনার তরী বেয়ে এগিয়ে চলছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। আলো ছড়াচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। হলসহ যাবতীয়অপ্রাপ্তির আবসান আশু হতে যাচ্ছে। নিরন্তর নিবিড় প্রচেষ্টা আন্তরিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন। আলো আসছে আলো আসবেই এই প্রত্যয়।
লেখকসাংবাদিক

দেশ দেশান্তর


মমতার বিজয় আমাদের আশাবাদী করে না

. তারেক শামসুর রেহমান

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এখন মমতা ব্যানার্জি। দীর্ঘ বছর মতায় থাকা বামফ্রন্টকে পরাজিত করে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রীর আসনটিদখলকরতে সমর্থ হলেও থেকে আমাদের ফুল্ল হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। কেননা মমতা কেন্দ্রের মতাসীনদের সঙ্গে আছেন বেশ কয়েক বছর ধরে।এখন জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে আছেন। এক সময় বিজেপির সঙ্গেও ছিলেন, কেন্দ্রীয় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স) মিত্রছিলেন মমতা। অনেকদিন থেকেই মতার আশপাশে আছেন। আমাদের নেতা-নেত্রীরা যখনই নয়াদিল্লি যান, তখন দুব্যক্তির সঙ্গে অবশ্যই তারা দেখা করেন।তাদের একজন প্রণব মুখার্জি, অপরজন মমতা ব্যানার্জি। আমাদের নেতা-নেত্রীদের ধারণা তাদের দুজনের সঙ্গে দেখা করলে, পদ্মার ইলিশ, মিষ্টি আরসিরামিকের উপহার সামগ্রী নিয়ে গেলে তারা বাংলাদেশের সমস্যারসমাধানকরে দেবেন।
অতীতে জ্যোতি বসু যত দিন জীবিত ছিলেন, তিনি ছিলেন আমাদের আরেকটাভরসার স্থান কিন্তু বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান কী হয়েছে, আমরাতা সবাই জানি আমাদের সমস্যা এখানেই। যেখানে আন্তর্জাতিক আইন জাতিসংঘের সনদ অনুসরণ করে আমরা আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারছিনা, সেখানে আমরা ভরসা করছি কখনও জ্যোতি বসুর ওপর, কখনও প্রণব, কখনও মমতার ওপর। কিন্তু আমরা ভুলে যাই তারা রাজনীতি করেনসর্বভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। মমতা বা প্রণব বাবু বাংলায় কথা বললেও মূলত এরা ভারতীয়। ভারতের স্বার্থটা আগে। জ্যোতি বসু তো কমিউনিস্টছিলেন। আদি বাড়ি বাংলাদেশে। কমিউনিস্টরা সাধারণত নিপীড়িত শোষিত মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ায় বলে বলা হয়। কেননা তত্ত্বগতভাবে তারাআনতর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু বাংলাদেশের কোন সমস্যাটা সমাধান করে দিয়েছেন জ্যোতি বসু? একটিও নয়। অথচ জ্যোতি বসুর নাম শুনলেই আমরাগদগদ হয়ে গেছি।
কিশোরী ফেলানীকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ অমানবিকভাবে তার লাশ ঝুলিয়ে রাখল কয়েক ঘণ্টা, সেদিন কি মমতা এর প্রতিবাদ করেছিলেন? তিনিতো তখন কেন্দ্রের মন্ত্রী, ইউপিএ জোটের শরিক। মমতা প্রতিবাদ করেননি। বাংলাদেশের মানুষদের মূল্যবোধের প্রতি সহমর্মিতাও দেখাননি। কারণ তিনিসর্বভারতীয় রাজনীতি করেন, যেখানে বাংলাদেশকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। বাংলাদেশের স্বার্থ তাই ভারতীয় নেতাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়নি।যশোরের মেয়ে মমতা। তার জন্ম যশোরে হয়নি বটে, কিন্তু বাবার বাড়ি ছিল যশোরে। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির সময় তার পূর্বপুরুষ চলে গিয়েছিলপশ্চিমবঙ্গে। তিনি যে ধরনের নেত্রী, তাতে কেন্দ্র সরকার তার কথা শুনতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশ যে ধীরে ধীরে মরুময়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে শুধু ভারতেরপানি প্রত্যাহারের কারণে, মমতা কি ব্যাপারে কোনো দিন কোনো কথা বলেছেন? কেউ কি সে কথা বলে?
নির্বাচনে বিজয়ের পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে ফোন করেছিলেন। কথাটা প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের কাছ থেকে আমরা শুনিনি। তিনি ব্রিফিংওকরেননি। আমরা জানলাম মমতা ব্যানাজির মুখ থেকে (‘বাংলাদেশ থেকে হাসিনাদির ফোন পেয়েছি’) প্রধানমন্ত্রী কি এটা করতে পারেন! প্রটোকল কি তাকেঅনুমতি দেয়? একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী কী পারেন অন্য কোনো দেশের প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে? ব্রিটনের প্রধানমন্ত্রী কি জার্মানিররাইনল্যান্ড ফালসের অতি সম্প্র্রতি নির্বাচনে বিজয়ী মুখ্যমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন? না, জানাননি। কেননা প্রটোকল অনুযায়ী তিনি তা পারেন না।অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী তা করলেন। তারপর শুনুন মমতা কী বলেছেন। মমতার ভাষায়মনে হচ্ছে যেন দুই বাংলা এক হয়ে গেল’ (কালের কন্ঠ, ১৪ মে, পৃ.-১০) কী ভয়ঙ্কর কথা! ‘দুই বাংলা এক হয়ে গেল’! কী বোঝাতে চাচ্ছেন মমতা? আমাদের প্রধানমন্ত্রী ফোনে শুভেচ্ছা জানাবেন আর ভারতের নেতারাবলবেনদুই বাংলা এক হয়ে গেলএটা তো আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি! আমরা তো জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম করিনি। জন্য তো লাখলাখ লোক মারা যায়নি।
স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে আমরা পা দিয়েছি। এই চল্লিশ বছরেবন্ধুরাষ্ট্রভারতের সঙ্গে আমাদের যত সমস্যা বেড়েছে, দণি এশিয়ার অন্য কোনো দেশের সঙ্গেআমাদের সমস্যা নেই। গত ১৬ মে ছিল ফারাক্কা দিবস। পানির ন্যায্য হিস্যা ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ফারাক্কা মিছিল করেছিলেন মওলানাভাসানী। আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো মতায় এসেই নয়াদিল্লি ছুটে গিয়ে একটি চুক্তি করেছিলেন (১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে) কিন্তু যতটুকু পানিআমাদের পাওয়ার কথা সে পানি চুক্তি স্বারের পর কোনো দিনই আমরা পাইনি। অথচ ওই চুক্তি নিয়ে কতঅর্জনেরকথা বলা হয়। তিস্তার পানি বণ্টননিয়েও কোনো খবর নেই। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে যখন আমরা সোচ্চার, তখন আমাদের সংসদ সদস্যরাপ্রমোদ বিহারেগেলেন, হেলিকপ্টারে ঘুরলেন, জানালেন তারা কিছুই দেখতে পাননি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশ তিগ্রস্থ হয়। তার কথা যখন পত্রিকাগুলোপ্রকাশ করছে, তখন মিজোরামের মানুষ ওই বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করছে। ভারতীয় নেতারা আমাদেরঘুম পাড়ানির গান শুনিয়েআমাদের ঘুমপাড়িয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
আমরা ভারতকে ট্রানজিট দিলাম। কিন্তু আমরা, বা নেপাল ভুটান এখনও  ট্রানজিট পায়নি। ভারত থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আমরা ভারতীয় হেভি ট্রাকচলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করছি। ওই  রাস্তা দিয়ে ভারতীয় হেভি ট্রাক যাবে কোনো ধরনের শুল্ক না দিয়েই। আর আমরা বছরের পর বছর গুনতে থাকবসুদ। বলা হয়েছিল বিদ্যুআসবে ভারত থেকে।  কোথায সেই বিদ্যুৎ? ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশী পণ্যেরচাহিদা ভারতে থাকলেও তা নানা ট্যারিফ প্যারা-ট্যারিফের কারণে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না।
জানা গেছে, আগামী বছরের জন্য ভারত শুল্কমুক্ত আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে।অথচ ভারতে বাংলাদেশী  ৬১ টি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশের অনুমতির কথা রয়েছে, যা দীর্ঘসূত্রতার জন্য আটকে আছে। সম্প্র্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকেআমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। জানা গেছে, দণি এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থারবিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির েেত্র বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা (দিনকাল, ১৭ মে)
বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। জন্য বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনই দেয়নি।এেেত্র মমতা বা প্রণব মুখার্জির মতো নেতারা কোনো দিন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াননি। কেননা তারা বাঙালি হয়েও স্বার্থ দেখেছে ভারতের। অথচআমাদের নেতারা বারবার ভারতীয়বাঙালি বাবুদেরদিকে তাকিয়ে থেকেছেন। বলতে দ্বিধা নেই, শুধু ভারতের কারণেই সার্ক ঠিকমত বিকশিত হতে পারছেনা। এর মূল কারণ, মূলত ভারতীয় আধিপত্যবাদী নীতি। নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রচন্দ প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে, তার অপসারণের পেছনেভারতের হাত ছিল। যারা দণি এশিয়ার রাজনীতির কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন ভারত নেপালের রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব খাটায়। ভারতীয়গোয়েন্দা সংস্থা নেপালে অত্যন্ত সক্রিয়। শ্রীলঙ্কার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা প্রভাকরণকে রাই তৈরি করেছিল। আসলে ভারত তার নিজেরদৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তথা দণি এশিয়াকে দেখতে চায়।
অর্থনীতিতে অনেক বড় শক্তি ভারত। দণি এশিয়ার দরিদ্রতা দূরীকরণে তথা উন্নয়নে ভারত বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এই আধিপত্যবাদী নীতিরকারণেই ভারত দণি এশিয়ায়বন্ধুশূন্যহতে যাচ্ছে। মমতা ব্যানার্জি, প্রণব মুখার্জি এরা সবাই মূলত এই আধিপত্যবাদী নীতিরই সমর্থন করছেন। সুতরাংআমাদের প্রধানমন্ত্রী মমতাকে ফোন করে যত আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলেন না কেন, এই আঞ্চলিক সহযোগিতা কোনো দিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না যতদিননা ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছিল। কিন্তু সেই সাহায্য সহযোগিতা অর্থহীন হয়ে গেছে ভারতেরআগ্রাসী মনোভাবের কারণে। ফেলানী যেন এক টুকরা বাংলাদেশ। যখন লাশ হয়ে ঝুলে থাকে ফেলানীরা তখন ভারতেরবন্ধুত্বকোথায় প্রশ্ন করার অধিকাররয়েছে দেশের জনগণের। বাংলাদেশকে তারা কীভাবে দেখে, ফেলানীর ঝুলে থাকা লাশ এর বড় প্রমাণ। তাই মমতা ব্যানার্জি যখন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেবিজয়ী হন, তখন আমাদের সাহিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানুষ সেখানে পরিবর্তন চেয়েছে। আরসেই পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আদৌ কোনো উন্নতি পরিলতি হবে না। যারা সম্পর্ক উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্তকরেন, তাদের শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন কালীন ভারতীয় সরকারের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বারকরেছিল, তখন মমতা এর প্রচন্ড বিরোধিতা করেছিলেন। মমতা হচ্ছেন ভারতীয় রানজীতিতেমোস্ট আনপ্রেডেকটিবল পার্সন’, যার ওপর আস্থা রাখা যায়না। যে কোনো সময় তিনি ভোল পাল্টাতে পারেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার আঁতাত কতদিন স্থায়ী হয়, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন এখন। মমতাব্যানার্জির কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা করার কিছু নেই।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়