মঙ্গলবার, ৮ মার্চ, ২০১১

সুদের ভয়াবহতা ও আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা - ফারজানা হামিদ


মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কালামে সুদ বুঝানোর জন্য যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন তার নাম হলো রিবা। রিবা শব্দটির অর্থ হলো অতিরিক্ত, বেশি, বৃদ্ধি, বিকাশ। অর্থাৎ রিবা হচ্ছে সেই বাড়তি অর্থ যা ঋণদাতা পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দিয়ে তারই বিনিময় হিসাবে ঋণ গ্রহীতার নিকট থেকে আদায় করে থাকে। রিবা হচ্ছে সেই বাড়তি অর্থ যা কোন মালের বিনিময় নয়। আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষই সুদী ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। সুদ সম্পর্কে তারা যথেষ্ট জ্ঞাত নয়। তাদের কাছে সুদ একটি সাধারণ বিষয়। বর্তমানে প্রচলিত ব্যাংকিং ধারায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে লেনদেন করার ফলে তারা যে সুদের সাথে প্রত্য ও পরো ভাবে জড়িত হচ্ছে এ সম্পর্কে তারা সচেতনতা বোধ করেনা। কিভাবে সম্পদকে বৃদ্ধি করা যায় এটাই তাদের প্রধান নেশা, এর বিনিময়ে যে কি ভয়াবহতা তাদের জীবনকে ধ্বংস করে দেয় তা তারা আচঁ করতে পারেনা। অনেক েেত্রই লোক মুখে শোনা যায় যে, ইসলামী ব্যাংক গুলো সুদ খায় তবে ঘুরিয়ে খায়, সোজাসুজি খায় না। আবার এ কথাও শোনা যায় যে, ইসলামী ব্যাংক গুলো সুদ খায় তবে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর তুলনায় কম খায়। এ কথাগুলোর আসলেই কোন ভিত্তি নেই। আমার মতে তাদের এ ধারণা নিছক অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা তারা না বুঝেই এ ধরণের কথাবার্তা বলে থাকেন। বাহ্যিক দিক থেকে উভয় ব্যাংকের কার্যাবলী  একই মনে হলেও মূলত এক নয়। এই বিষয়টা বুঝতে হলে দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে এ বিষয়টি ধারণা পরিষ্কার করা যেতে পারে। যেমন কোন গরু জবেহের সময় ‘বিসমিল্লাহ অথবা আল্লাহর নাম’ নিয়ে জবেহ করা আর ‘বিসমিল্লাহ অথবা আল্লাহর নাম’ না নিয়ে জবেহ করা এক বিষয় নয়। যদিও বাহ্যিক দিক থেকে উভয়ই গরু জবেহের ধরণ,জবেহের উপকরণ তথা ছুরি, রশি ইত্যাদি একই ধরণের হলেও তবুও উভয় গরুর মধ্যে ‘বিসমিল্লাহ অথবা আল্লাহর নাম’ নিয়ে জবেহ করার কারনে একটি হালাল আর ‘বিসমিল্লাহ অথবা আল্লাহর নাম’ না নিয়ে জবেহ করার কারণে অন্যটি হারামে পরিণত হয়।
এমনিভাবে বাহ্যিক দিক থেকে ইসলামী ব্যাংক ও প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থা একই মনে হলেও সূক্ষ্ম পার্থক্যের কারণে উভয়ের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। যেখানে প্রচলিত ব্যাংকগুলো ডিপোজিট সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট শতকরা হারে, সেখানে ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে চুক্তি করে যে, ব্যাংক তাদের অর্থ ব্যবসায় খাটিয়ে যে লাভ বা মুনাফা হবে তা থেকে তাদেরকে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক একটি শতকরা হারে এই মুনাফা প্রদান করবে। আর লোকসান হলে পূর্বচুক্তি মোতাবেকই গ্রাহকগণ তা বহন করবে। ‘বিসমিল্লাহ অথবা আল্লাহর নাম’ এখানে চুক্তির শর্তের কারণেই ইসলামী ব্যাংক ও প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। আর এ চুক্তির শর্তগুলো যারা বুঝতে চায় না বা বুঝে না তারাই উপরোক্ত ঐ ধরণের নানা কথাবার্তা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে তোলে। সুদ এমন একটি ফাঁদ যে ফাঁদে আটকে কেবল মানুষ মৃত্যুর মাধ্যমেই ধ্বংস হয়ে যায় না। বরং অনন্ত কালের জন্য চরম দশায় নিপতিত হয়ে ধুকে ধুকে জ্বলতে থাকবে অথচ সে যন্ত্রণা কিছুমাত্র শেষ হবে না। সুদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার জীবনের তিনটি পর্যায়ে সুদের ভয়াবহতা আঁচ করতে পারে। সুদ মানুয়ের তিনটি বিষয়ের উপর আঘাত হানে।
প্রথমত মানুষের ইমানদারীতায়, দ্বিতীয়ত পরকালীন মুক্তির বিষয়ে, তৃতীয়ত মানুষের ইহকালীন অর্থনৈতিক মুক্তির উপর। অর্থাৎ সুদের কারণে সুদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার অন্যতম মৌলিক পরিচয় ইমানদার হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন হতে বঞ্চিত হয়। পরকালীন জীবনে আল্লাহর অপূর্ব নিয়ামত জান্নাত লাভের পরিবর্তে জাহান্নামে নিপতিত হওয়াকে নিশ্চিত করে। এবং যে দুনিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তথা সুখ-শান্তি হতে বঞ্চিত হয়। অর্থাৎ তার সব কূলই বৃথা। আমরা যদি সুদ মুক্ত হয়ে থাকতে পারি তবেই আমাদের জীবন হবে স্বার্থক । এছাড়া আমাদেরকে কঠোর আযাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুদ সম্পর্কে কুরআন মাজীদের কয়েকটি আয়াত -
“যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তির ন্যায় দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা জ্ঞানশূণ্য করে দিয়েছে। এই জন্য যে তারা বলে ক্রয়-বিক্রয় তো সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। যার কাছে রবের এ নিদের্শ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে তবে অতীতে যা হয়েছে তা তারই এবং তার ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে। আর যারা আবার আরাম্ভ করবে তারাই জাহান্নামী। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।” (সুরা বাকারা ঃ ২৭৫)
মানুষের ধনসম্পদ বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে সুদ দিয়ে থাকো তা আল্লাহর দৃষ্টিতে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু যে যাকাত  তোমরা  আল্লাহর সন্তুষ্টি  লাভের জন্য দিয়ে থাকো তাই বৃদ্ধি পায়; তারাই সমৃদ্ধিশালী। (সূরা ঃ রুম ৩৯)
হে ইমানদারগণ তোমরা এই চক্রবৃদ্ধি সুদ খেয়ো না এবং আল্লাকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। (আল ইমরান ১৩০)
আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ণ করবেন এবং দান কে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালোবাসেন না। (সূরা বাকারা ২৭৬)।  যদি তোমরা সুদের ব্যবসা না ছাড়ো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধেও জন্য প্রস্তুত হও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। এতে তোমরা অত্যাচার করবে না এবং অত্যাচারিতও হবে না। (সূরা বাকরা ২৭৯)
উপোরক্ত আয়াতগুলো হতে আমরা বুঝতে পারি, যারা পরকালকে অস্বীকার করে বা মিথ্যা মনে করে কেবলমাত্র তারাই সুদী ব্যবসায়ে অর্ন্তভূক্ত হয়ে আল্লাহর বিধান লঙ্গন করতে পারে। যেখানে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুদ সম্পর্কে এত আয়াত নাযিল করেছেন। যেন আমরা কোনভাবেই সুদী ব্যবসায়ে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে না পারি। যদি মান্য না করি তাহলে তো আল্লাহর অস্তিত্বকেই অবিশ্বাস করা হল। আর যারা এরপরেও সুদীকারবারীরা তারা নিশ্চিত জাহান্নামী হবে এবং সেখানে চিরকাল থাকবে। মহান আল্লাহ এ বিষয়ে এমন কোন সুযোগ রাখেননি যে,সুদ খেলে তাকে কিছুটা রেহাই দেয়া যাবে। বরং তার জাহান্নামী হওয়ার বিষয়টা নিশ্চিতরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। জাহান্নাম একটা অদৃশ্য বিষয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কালামে জাহান্নামের চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।
তারা আমার আয়াতগুলোকে অস্বীকার করেছে তাদের অচিরেই আমি জাহান্নামের আগুনে পুড়িয়ে দেব, অতপর (পুড়ে যখন) তাদের দেহের চামড়া গলে যাবে তখন আমি তার বদলে নতুন চামড়া বানিয়ে দেবো যাতে করে তারা আযাব ভোগ করতে পারে। (সূরা নিসা ৫৬)
রাসূল (সা:) সুদখোরদের বিষয়ে বলেছেন- সামুর ইবনে জুনদুব (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন নবী (সা) বলেছেন আজ রাতে আমি স্বপ্নে দু’জন লোককে দেখলাম। তারা আমার নিকট এসে আমাকে নিয়ে একটি পবিত্র ভূমিতে গেল। আমরা চলতে চলতে একটি রক্ত নদীর তীরে পৌছে গেলাম। নদীর মধ্যখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। আর নদীর তীরে একটি লোক দাঁড়িয়ে ছিল যার সামনে ছিল কিছু পাথর এরপর নদীর মাঝে দাঁড়নো ব্যক্তি। তীরের দিকে অগ্রসর হলে তীরে দাঁড়ানো লোকটি তার মুুখমন্ডল ল্য করে পাথর নিপে করল এবং সে আগে যেখানে ছিল সেখানেই উঠে আসার চেষ্টা করছে তখন তীরের লোকটি তার মুখ ল্য করে পাথর ছুড়ে মারছে। যার ফলে সে (পূর্বাবস্থায়) ফিরে যাচ্ছে। নবী (সা:) বলেন আমি জিজ্ঞেস করলাম এ লোকটি কে? কী কারণে তার এ শাস্তি হচেছ। তারা (আমার সাথের লোক দু’জন) বললো, নদীর মধ্যে দাঁড়নো যে লোকটি দেখলেন, সে একজন সুদখোর।
প্রকৃত পে আমরা যে সম্পদ গড়ে যাচ্ছি এর কোন কিছুই আমাদের সাথে যাবে না।
রাসূল (সা:) বলেছেন তিনটি সম্পদ তোমাদের নিজেদের।
এক. যা তোমরা খেয়েছ। দুই. যা তোমরা পরিধান করেছ। তিন. যা তোমরা আল্লাহর রাস্তায় দান করেছ।
তবে আমরা কেন সুদের মাধ্যমে এত এত সম্পদ বাড়িয়ে চলেছি?

লেখক-
বি.কম (অনার্স)
এম.বি.এস (হিসাব বিজ্ঞান)
ইডেন মহিলা কলেজ

আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে মেজর জলিল -মু. শাহাদাৎ হোসাইন


বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বীরত্ব শৃংখলাও স্বার্বোভৌমত্বতার কথা ভাবলেই মেজর এম,এ জলিলের নাম চলে আসে। মেজর এম.এ  জলিল একটি নাম, একটি ইতিহাস। তিনি ছিলেন  একাধারে সংগ্রামী দেশপ্রেমিক  সহজ সরল ও সাহসী, তেমনি ছিলেন সুশৃংখল ও অদম্য কষ্টসহিষ্ণু একজন সোনার মানুষ। তিনি ছিলেন রাজনৈতিক সংগঠক  অন্যদিকে ছিলেন  মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনা নায়ক। তাই তিনি ছিলেন  একজন চৌকস মানুষ। সৈনিক জীবনে তাকে যেমন করেছেন সাহসী সুশৃংখল ও কষ্ট সহিষ্ণু আর মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণে তাকে করেছে আরো লড়াকু। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এ েেত্র তিনি বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মুখীন  হন। আর তিনি সাহসীকতার সাথে কাজ করতে সবসময় বেশি পছন্দ করতে তাই আমৃত্যু পর্যন্ত সংগ্রামী জীবন তাকে করেছিল অকুতোভয় প্রতিবাদী শোষক ও লুটেরা শাসনের প্রতি দৃঢ় আপোসহীস।  অবশেষে আদর্শিক  চিন্তাকে পরিবর্তন ও ইসলামের  দিকে  প্রত্যাবর্তন তাকে দিয়েছিল জীবনের চরম পূর্ণতা। তাই তিনি বলেছেন  মানুষের অন্তরের অন্ত:স্থলে রয়েছে  সত্য ও মুক্তি অনুসন্ধানের  আজন্ম পিপাসা। আমার জীবনের ল্য অর্জনে আমি অটল, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা আমার স্বভাব নয়। এটাই একজন  মুসলমানের প্রকৃত সিফাত বা গুণ। তিনি জন্মের আগেই এতিম হন। ১৯৪২ সালের ৯ই ফেব্র“য়ারি বরিশালের উজিরপুর থানা সদরে মামার বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। তার সংগ্রাম যেন জন্মের আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। জীবনের প্রথমভাগে বিভিন্ন কঠোরতার সম্মুখীন হন। এই পৃথিবীতে তার মায়ের ভালোবাসা ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
 ১৯৬০ সালে স্থানীয় ড.ই. ওহংঃরঃঁঃব  থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এ সময় তিনি দুটি উপন্যাস “পথের কাঙ্গাল” ও “রীতি” রচনা করেন। যদিও পরবর্তীতে পান্ডুলিপি ২টি হারিয়ে যায়। ১৯৬১  সালে তিনি ইয়াং ক্যাডেটে ভর্তি হন। পাকিস্তানেও তিনি পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে ওহঃবৎসধফরধঃব পাশ করেন এবং কাবুলে সামরিক একাডেমীতে প্রশিণ নেন। ১৯৬৫ সালে তিনি কমিশন লাভ করেন এবং আর্টিলারিতে যোগদেন।  একই বছরে তিনি ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে ১২নং বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৬৬ সালে সামরিক একাডেমি থেকে এৎধঃঁধঃরড়হ অর্জন করেন। পরে তিনি ইতিহাসে এম এ পাশ করেন। তিনি ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্র“য়ারি ছুটি নিয়ে অসুস্থ মাকে দেখতে দেশে আসেন। ২৫ মার্চের কালোরাতে দেশের চেহারাটা পাল্টে যায় এবং ২৬ মার্চ তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত বরিশাল ও পটুয়াখালীকে মুক্ত অঞ্চল হিসেবে বজায় রাখতে সম হয়। ৭ এপ্রিল মেজর জলিল খুলনা রেডিও ষ্টেশন মুক্ত করতে অপারেশন চালান আবার ২১ এপ্রিল অস্ত্র সংগ্রহে সুন্দর বনের পথ ধরে তিনি ভারতে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে ৯ নং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যোগদান করে মুক্তি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৬ ডিসেম্বর স্বদেশ স্বাধীন হয়। ১৮ ডিসেম্বর তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং ২৬ ডিসেম্বর বরিশালের হেমায়েত উদ্দীন খেলার মাঠে তিনি ভাষণ দেন।
সেখানে তাকে সংবর্ধনা দিতে অভূতপূর্ব লোকের সমাগম হয়। স্বাধীনতার পর ভারত স্বদেশকে তাদের একটা প্রদেশ বানাতে চেয়েছিল এবং সেদেশের সেনাবাহিনী এদেশের সম্পদ ও কর্তৃত্ব কেড়ে নিতে চেয়েছিল। ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনের পাঁচটি আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং নির্বাচনে তার বিজয় ছিল সুনিশ্চিত  কিন্তু মতাসীন আওয়ামীলীগ তাকে বিজয়ী হতে দেয়নি।
বলা বাহুল্য রাজনীতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট পর্যন্ত শেখ মুজিবের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপ ছিলেন মেজর এম এ জলিল। ১৯৭৪ সালে ১৭ মার্চ স্ব-রাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেড়াও কর্মসূচীতে পুলিশ গুলি করলে জাসদের বহু নেতা নিহত হন।
মেজর জলিল নিজেও হন আহত। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ৮ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২৩ নভেম্বর আবার গ্রেফতার করা হয়। সাময়িক আদালত কর্ণেল তাহের ও মেজর এম এ জলিল ফাঁসির আদেশ হয় পরে মুক্তি যুদ্ধের বিশেষ অবদানের জন্য মৃত্যুদন্ড  মওকূপ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড  দেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে চার বছর কারা ভোগ করার পর ১৯৮০ সালে ২৬ শে মার্চ মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৮২ টাঙ্গাইলের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কন্যা সায়মা আক্তার কে বিয়ে করেন এবং তাদের  ঘরে সারাহ ও ফারাহ নামে দু’কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। এদিকে মেজর জলিলের চিন্তা চেতনার ক্রমশ পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ১৯৮৪ সালের ৩ নভেম্বর জাসদ থেকে পদত্যাগ করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “ দলীয় জীবনে জাসদের নেতা কর্মীরা ধর্র্মীয় মূল্যেবোধ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দিয়েছে। এ বিসর্জন দেওয়ার ফলে নৈতিকতা ও মূল্যেবোধে পরিচালিত মানব দেহ থেকে নিজেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সমাজে বসবাসরত জনগণকে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সংস্কৃতির জীবন এবং মূল্যেবোধ থেকে মোটেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।  প্রচলিত সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনধারা থেকে কেবল নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখলেই বিকল্প সংস্কৃতির জন্ম নেয় না। বরং এ ধরনের রণকৌশল অবলম্বন সমাজে  প্রচলিত নীতি নৈতিকতা আচার অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক মূল্যেবোধের প্রতি তাচ্ছিল্য উপহাস ঘৃণার বহি:প্রকাশ ঘটায় যা প্রকারান্তরে বিপ্লবী আন্দোলনের বিপে চলে যায়।” ইসলাম ধর্ম এদেশের ৯০% গণমানুষের কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসই নয় ইসলাম ধর্মভিত্তিক নীতি-নৈতিকতা আচার অনুষ্ঠান উৎসব পর্ব সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রবাহের সাথে ইসলামী আদর্শ অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। জন্ম থেকে শুরু করে জানাজা পর্যন্ত ইসলামের নীতি নির্দেশের আওতায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ট  মানুষের জীবন ।
এমন একটি জীবন দর্শনকে অবহেলা উপো কিংবা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে চলার নীতিকে বাস্তবসম্মত কিংবা বিজ্ঞানসম্মত বলা হয় না। প্রগতিশীল আন্দোলনের স্বার্থেই ইসলাম ধর্মের বিজ্ঞান সম্মত মূল্যায়ন অত্যাবশ্যকীয় বলে আমি মনে করি। কারণ ইসলাম শোষণ, জুলুম ,অন্যায়, অসুন্দর সহ সব রকম স্বৈরশাসন এবং মানুষের ওপর প্রভূত্বের ঘোর বিরোধী। ইসলাম পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ রাজতন্ত্র উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়। সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা ইসলামে নিষিদ্ধ। কারণ সব মালিকানা একমাত্র আল্লাহরই। মানুষ হচ্ছে তার কেবল প্রয়োজন মেটানোর জন্য আমানাতদার বা কেয়ার টেকার ( তথ্য সূত্র কৈফিয়ত ও কিছু কথা গ্রন্থ)।
সেনা নায়ক মেজর এম এ জলিল এমন কিছু গ্রন্থ লিখে গেছেন যা আমাদের জীবনের সর্বণে দিক নিদের্শনার বাতিঘর। তার রেখা “অরতি স্বাধীনতাই পরাধীনতা”। দেশ প্রেমের বলিষ্ঠ ও উচ্চকিত শ্লোগানের রূপান্তরিত হয়েছে। তার লেখা কয়েকটি বই : সীমাহীন সমর( মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির ডায়েরী), মার্কবাদ ( প্রবন্ধ), সূর্যোদয় (রাজনৈতিক উপন্যাস), কেফিয়াত ও কিছু কথা (প্রবন্ধ), দাবী আন্দোলন দাযিত্ব (প্রবন্ধ), দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবন দর্শন (প্রবন্ধ)   অরতি স্বাধীনতাই পরাধীনতা (প্রবন্ধ)  অংবধৎংয ভড়ৎ ওফবহঃরঃু (ঊধংংধুং) জাসদ থেকে পদত্যাগ করার ১৬দিন পরে তিনি “জাতীয় মুক্তি আন্দোলন” নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই সময় তিনি মরহুম হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে “সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ” গঠনে অংশ নেন। ১৯৮৫ সনের জানুয়ারীতে তাকে গৃহবন্ধী করা হয়। একমাস ছিলেন বন্ধি। সৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারনে ১৯৮৭ সালের ৩০শে ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালে মার্চ পর্যন্ত সরকার তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে আঠক রাখে। এর আগে মেজর এম.এ জলিল লিবিয়া, লেবানন, ইরান, ব্রিটেন ও পাকিস্থানে কয়েকদিন আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালের ১১ নভেম্বর তিনি পাকিস্থানে যান। ১৬ নভেম্বর ইসলামাবাদে তিনি হৃদ রোগে আক্রান্ত হলে সাথে সাথে কিনিকে ভর্তি করা হয়। ১৯ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় এ মহানায়কের যবনিকা ঘটে। ২২নভেম্বর তার মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। সম্পূর্ণ সামররিক মর্যাদায় তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। তাকে দাফনের মাধ্যমেই মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে লাশ দাপন শুরু হয়। তিনি বেঁচে থাকলে হয়ত মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক থেকে ইসলামের মহানায়কে পরিণত হতেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন তার সংগ্রামী জীবনকে ইসলামের রঙে রঙিন করতে।
তাই তাকে ইসলাম বিরোধীতাকারীরা সহজে সহ্য করতে পারতেন না। কারণ তার জীবন হয়ে উঠেছিল ইসলামের শানিত তরবারীর ন্যায় গণমানুষের তরে কথা বলার কারণে। তাই তাকে সহ্য করতে হয়েছে বিষেধাগার যন্ত্রনা। আধিপত্যবাধীদের প থেকে তাই বলা যায় তিনি তার জীবনের সকল কর্ম কান্ডের মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি কারো কাছে নয়,  মহান প্রতি পালকের কাছেই শুধুমাত্র মাথানত করতে জানতেন। বিনম্র শ্রদ্ধাভরে স্মরন করছি এবং তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। কারণ আমাদের কান্তিকালে তাঁরমত জলিলের খুবই দরকার।
লেখক:
শিার্থী, বি.এ (অনার্স) এম,এ (ইংরেজী)
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

টিভি কম দেখুন সময়কে কাজে লাগান -শাহ আবদুল হান্নান


টেলিভিশন আধুনিক সভ্যতার একটি বড় অবদান। আজকে এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্ঞানের বিকাশ হয়েছে, যোগাযোগ বৃদ্ধি হয়েছে। মানুষের পরস্পরের জানাজানির সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। এসবই বিজ্ঞানের অবদান।
বিজ্ঞানের এ যুগে আমাদের অবশ্যই টেলিভিশনের পজেটিভ দিকটি দেখতে হবে। টেলিভিশন আবিষ্কারের পর থেকে অনেক বছর পার হয়ে গেছে। ভালোমন্দ, সুবিধা-অসুবিধার দিকসহ এর সামগ্রিক প্রভাব আজ আমাদের কাছে স্পষ্ট। বর্তমানে আমরা এমন পযার্য়ে এসে পৌছেছি যে, টেলিভিশনের খারাপ দিকগুলো রিভিউ করে দেখার প্রয়োজন। আমি ইংল্যান্ড এবং আমেরিকায় দেখেছি অনেক বাড়িতে টিভি রাখা হয় না। এ মানসিকতা সম্পন্ন লোক সেখানে আছে। তবে অন্যান্য দেশের কথা আমি ঠিক বলতে পারব না।
বছর তিনেক আগে আমার এক ছাত্র আমাকে একটি বই উপহার দেয়। বইটির নাম ছিল (ঋড়ঁৎ অৎমঁসবহঃং ভড়ৎ ঃযব ঊষবসরহধঃরড়হ ড়ভ ঞবষবারংরড়হ) লেখক  ঔবৎৎু গবহফবৎ, বইটি আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হয়। সেখানে টেলিভিশনের তিকর ছয়টি দিক তুলে ধরে বলা হয়েছে, এ ছয়টি কারণে টিভি বন্ধ করে দেয়া উচিত। এছাড়াও ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে টেলিভিশনের তিকর দিকগুলো আমাদের সামনে বিভিন্ন সময় তুলে ধরা হয় এসব কী প্রমাণ করে? এসব প্রমাণ করে যে টিভির ব্যবহার বা টিভির কল্যাণকামিতা সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সে প্রশ্ন কতটুকু সঠিক আমি সে সামগ্রিক আলোচনায় যাচ্ছি না। কিন্তু সে প্রশ্ন উঠেছে, আর তা উঠেছে পাশ্চত্য দেশগুলোতে। একরম বই আমাদের দেশেও লেখা হয়নি।
আমাদের দেশে সরকারি, বেসরকারি টিভি চ্যানেলের পাশাপাশি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো উন্মক্ত। এসব চ্যানেলের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অন্যতম প্রধান দিকটি হলো খবর। এরপরই দেখা যায় নাচ, গান আর সিনেমা। নাচ, গান, সিনেমাই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ৫০ থেকে ৬০ ভাগ জুড়ে রয়েছে। সেখানে খেলাধূলার প্রোগ্রাম রয়েছে। তবে খেলাধুলার জন্য কয়েকটি আলাদা চ্যানেলই আছে। ২৪ ঘন্টাই খেলাধূলা সংক্রান্ত অনুষ্ঠান সেখানে দেখানো হচ্ছে। আবার কার্টুন চ্যানেলও আছে। কিন্তু সমাজের এর প্রভাব কি পড়ছে? বাস্তবে এটিকে কীভাবে দেখা হচ্ছে এবং মানুষের সময় কীভাবে ব্যয় হচ্ছে? সার্বিকভাবে আমরা দেখতে পাই শিশু- কিশোর থেকে যুবক শ্রেণী পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের ২৪ ঘন্টার মধ্যে অনেকেরই ৬/৭ ঘন্টা টেলিভিশনের পিছনে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ছেলেরা স্পোর্টস এডিকশনের বা নেশার ফলে ৫/৬ ঘন্টা খেলা দেখার জন্য ব্যয় করছে। এটি অনেকের েেত্র প্রযোজ্য। এতে তাদের অন্যান্য কাজের ব্যাঘাত হচ্ছে। লেখাপড়ার তি হচ্ছে। তেমনি বাচ্চারা কার্টুন নিয়ে প্রায় ব্যস্ত থাকে। আবার কার্টুনের সব ভালো আমি বলবো না। সেখানেও মারামারি আছে, অস্ত্র চালানোর ব্যাপার আছে সেসব দেখে বাচ্চাদের একটু বয়স হলে তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, আমার বন্দুক কোথায়? একজন যদি তার দিনের ৪ বা ৬ ঘন্টা টেলিভিশনের পিছনে ব্যয় করে তাহলে অবস্থা কেমন দাড়াঁয়।
তুলনামূলক ভাবে ভালো প্রোগ্রাম হলেও সেখানে ৪/৫ ঘন্টা ব্যয়ের প্রশ্ন চলে আসে। আমাকে বিভিন্ন ব্যক্তি টিভি সিরিয়ালের কথা বলেছে সেগুলো কতটুকু ভালো, কতটুকু কল্যাণকর আর জ্ঞানের, আমি সে বিষয়ের দিকে যাবো না। এ সিরিয়াল, মেগাসিরিয়াল প্রোগ্রামের একটি প্রভাব হলো, এর ফলে মহিলারা এ প্রোগ্রাম দেখতে যেয়ে প্রতিবেশীর সাথে দেখা-সাাতে সময় বের করতে পারেন না। আগে মহিলারা যেভাবে এক বাড়িতে থেকে আরেক বাড়িতে যেতেন,পারস্পরিক যোগাযোগ রা করতেন পাশের বাড়ি যেতেন সেটা কমে এসছে এবং তারা সর্ম্পূণ ঘরমুখী হয়ে যাচ্ছেন। তাদের মাথায় থাকছে কোন কোন সময় কোন প্রোগ্রাম শুরু হবে আর কোনটা দেখতে হবে। এর ফলে দেখা গেছে আমাদের সামজিকতা পর্যন্ত তিগ্রস্থ হয়ে গেছে। এতে আমাদের পারস্পরিক সহানুভূতি, কল্যাণকামিতা,খোজঁ খবর নেয়া ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
এ স্পোর্টসে, কার্টুন, নাচ, গান সিনেমা কিংবা সিরিয়াল মেগাসিরিয়াল প্রোগ্রামের মাধ্যমে মানুষের যে খুব একটা মানসিক উন্নয়ন হয় কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় তা বলা যায় না। এর সার্বিক প্রভাব নৈতিকও নয়, কল্যাণকরও নয়। কিছু কিছু ভালো প্রোগ্রাম আছে। এ বিষয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু সার্বিক প্রভাব কল্যানকর তা বলা মুশকিল।
টেলিভিশন প্রসঙ্গে আমি এখানে যে বিষয়টি জাতির সামনে তুলে ধরতে চাই তা হচ্ছে সময় অপচয় প্রসঙ্গ। টেলিভিশন প্রোগ্রামে  মধ্যে কতটা আদর্শ, নৈতিকতা আছে আর কতটা নেই এসব আলোচনা আমার আজকের মূল বিষয় নয়। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে যে, এতে কতটা সময় যাচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যেই ল্য করেছি ছেলেমেয়ে, বাচ্চা, গৃহিনী আর ছাত্রদের কি পরিমাণ সময় টেলিভিশনের প্রোগ্রামের পিছনে যায়। আমরা এও ল্য করলাম যে এ সময়ের পরিমান দিনে ১ ঘন্টা নয়, বরং গড়ে ৪ ঘন্টা ৫ ঘন্টা যাচ্ছে। কোনো কোনো েেত্র ৭/৮ ঘন্টাও যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি জাতির জন্য ভয়াবহ তিকর। একটি স্টাডিতে দেখা গেছে যে. একজন মানুষের ৫০/৬০ বছরের জীবনে ১২ বছর সময়ই ব্যয়  হয়েছে শুধু টিভির পিছনে। একটি জীবনে যদি এ ১২ বছরই টিভির পিছনে যায় তাহলে তার অবস্থা কেমন আমরা কল্পনা করতে পারি। উৎ.ঐরংযধহ অষঃধষরন তার ঞৎধরহরম এঁরফব ঋড়ৎ ওংষধসরপ ডড়ৎশবৎং বইতে এ হিসাবের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এর সমাধান কি? আমার মনে হয় এর জন্য একটি আন্দোলন দরকার। এ আন্দোলন সরকারি, বেসরকারি, ব্যক্তিগত, সামাজিক সকল পর্যায় থেকে করতে হবে। সে আন্দোলনের শ্লোগান হবে - ‘আমরা টিভি দেখব কম’।  এখানে আমরা টিভি দেখব না বা টিভি ব্যান্ড করে দিতে বলছি না। এখানে আমরা শুধু বলছি, টিভি দেখার সময় আমাদের কমাতে হবে। যে যার পছন্দ অনুযায়ী টিভি প্রোগ্রাম বেছে নিতে পারে। কিন্তু এ জন্য সারাদিনই তাকে টিভি দেখতে হবে তাঁর কোনো যৌক্তিকতা নেই। যে খবর দেখতে চায় দেখবে। কেউ তার নিজের সবচেয়ে বেশি পছন্দের অনুষ্ঠান বেছে নিয়ে যদি শুধু সেটিই সীমিত সময় দেখে তাহলেও তার অনেক সময় বেঁেচ যায়। দিনে ১/২ বার খবরসহ সপ্তাহে কিছু ভালো অনুষ্ঠান কিংবা শিমূলক অনুষ্ঠান, কার্টুন, ছবি ইত্যাদি দেখল। তবে আমাদেরকে টিভি দেখার  সময় অবশ্য অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে যদি আমরা জাতি গঠন করতে চাই। জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে সময়। সময় হচ্ছে জীবন। জীবন হচ্ছে সময়। সময়ই যদি আমরা অপচয় করে দেই তাহলে কি করে আমাদের উন্নতি সম্ভব হবে। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক কোনো উন্নয়নই সময়ের সদ্ব্যবহার ছাড়া সম্ভব নয়। “তাই আমাদের শ্লোগান হওয়া উচিত আমরা টেলিভিশন কম দেখব এবং আমরা সময়কে কাজে লাগাব।” এর ফলে যে বিশাল সময় বেঁেচ যাবে তা আমরা ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারি। যেমন আমরা আমাদের ছাত্রজীবনের সময়গুলোতে বিভিন্ন সাহিত্য পড়তাম। নবী রাসূলের জীবনী, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রসহ বিভিন্ন ধরনের সাহিত্য পড়তাম।
আজকের দিনে সেগুলো পড়ার সংখ্যা খুবই কমে গেছে। এটি যে কত বড় তি তা আমরা একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারব। সাহিত্য না পড়ার জন্যও সময়কে অনেক েেত্র দায়ী করা হয়। সাহিত্য হচ্ছে মানুষের জীবনের দর্পণ। এটি একটি দিক। অন্যদিক হচ্ছে সাহিত্য মানুষকে মহৎ করে। যারা ওয়ার্ল্ড কাসিক পড়বে, টলষ্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, পার্লবাক আর রবীন্দ্রনাথ হোক বা আল্লামা ইকবাল হোক, নজরুলের হোক তারাই জীবনে মহৎ হবে। এদের দ্বারা মানবতা কল্যাণ পাবে। অথচ আজকে সে রকম লোক তৈরি হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হলো বেশির ভাগ লোক আজকে সাহিত্য পড়ছে না। যখন একজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে সেখানে সে প্রফেশনাল শিাই পাচ্ছে। সেখানেও সাহিত্যের গুরুত্ব কম।  বাংলা পড়লে আমরা নাক সিটকাচ্ছি। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বলছে এগুলো পড়ার দরকার কি? আমাদের সে শিা দরকার যা আমাদের কনস্ট্রাকশনের কাজে লাগবে । কিন্তু প্রকৃতপে এর দ্বারা মানুষ রোবট তৈরি হবে। মানুষ তৈরি হবে না । আমরা  এ জিনিসটি ভুলে যাচ্ছি।
এ পরিস্থিতিতে আমার মনে হচ্ছে আমাদের একটি আত্মনিয়ন্ত্রণ দরকার। আমাদের সময় বাঁচাতে হবে। আমরা সময়কে বাঁচাবো । সময়কে মানবতার কাজে লাগাব মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করব। জাতির কল্যাণে জাতি গঠনে ব্যবহার করব। এ সময়কে আমরা ফ্যামিলির ডেভেলপমেন্টের কাজে ব্যবহার করব। নিজের আত্মগঠনে ব্যবহার করব। আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশীর জন্য ব্যবহার করব।
নিজেরা নিজেদের সময়কে বাঁচাবো। আমরা কতণ টিভি দেখব তা সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কিন্তু সরকার চাইলে খারাপ চ্যানেলগুলো যতদিন পর্যন্ত ততদিন সেসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ উদ্যোগ অবশ্যই সরকারকে নেয়া উচিত। সরকারকে অবশ্যই এসব খারাপ চ্যানেলগুলে ব্যাপারে হস্তপে করতে হবে।
সর্বশেষে গোটা জাতির কাছে বলতে চাই সকলেই এ বিষয়টি ভেবে দেখবেন এবং প্রত্যেকেই তার নিজের ফ্যামিলিতে টিভি ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করবেন।
এ ব্যাপারে ফ্যামিলির মায়েদের বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। তারা নিজেরাই যদি বেশি করে টিভি দেখেন তাহলে বাচ্চাদের কে আটকানো সম্ভব হবে না বলে আমি মনে করি। এ বিষয়টি সকলেই বিশেষ বিবেচনা করে দেখবেন। পত্রিকাগুলো এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারে। এটি একটি জাতীয় আন্দোলনে  পরিণত হতে পারে। যা আমাদেরই কল্যাণ হবে। আমার মতে,“আমরা টিভি দেখব কম ঃ সময়কে কাজে লাগাব” এ স্লোগান জাতিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

লেখক ঃ
সাবেক সচিব
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

প্রিয়তম নবী (সা) এর আদর্শ অনুসরণ : প্রকৃত স্বরূপ -মু সাকিল উদ্দিন


মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে  মানুষ সৃষ্টি করে তাঁর বিধান দিয়েছেন দিক-নিদেশর্না হিসেবে। মানুষের মধ্য থেকেই একজনকে মনোনীত করেছেন নানা রকম সমাজ ও সম্প্রদায় থেকে। যাতে করে যে সমাজের মানুষ সে সমাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারে এবং আল্লাহ তায়ালার ওহী ভালভাবে বুঝতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুস্পষ্ট গ্রন্থের শপথ আমি এটা অবতীর্ণ করেছি কোরআন রূপে, আরবী ভাষায়, যাতে করে তোমরা বুঝতে পারো। এ গ্রন্থ মহান সারগর্ভ আমার নিকট সংরতি আছে। (সূরা-৪৩,আয়াত ২-৪)আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এ ঐশী গ্রন্থ এটি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানব জাতিকে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অন্ধকার হতে আলোতে বের করে আনতে পার। তাঁর পথে যিনি পরাক্রমশালী’। (সূরা-১৪, আয়াত -১) আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা ( দ্বীনের ব্যাপারে) ভারসাম্য বজায় রাখ এবং এর ওপর মজবুত ভাবে কায়েম থাক। আর জেনে রাখ, তোমাদের কেউ তার আমলের সাহায্যে মুক্তি পাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট হতে এ গ্রন্থ অবতীর্ণ, এতে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু ওরা বলে, এতো তার (মুহাম্মদের) নিজের রচনা। বরং এ তোমর প্রতিপালক হতে আগত সত্য’। (সূরা-৩২ আয়াত ১-৩)
এখানে আল্লাহ তায়ালা মানব জাতির জন্য পথ প্রদর্শন করেছেন কোরআন নাযিল করে। যা জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শিক ও রহমত রূপে পাঠিয়েছেন মুহাম্মদ (সাঃ) কে। এখন নবী করিম (সাঃ) কে অনুসরণ করাই হলো আমাদের মূলকর্তব্য। আল্লাহ তায়ালার বিধান নবী (সাঃ) যেভাবে পালন করেছেন সেভাবে পালন করাই হলো সুন্নাত। আর জীবন যাপনের েেত্র নবী (সাঃ) -ই হচ্ছে সর্বোত্তম আদর্শ এবং আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কাউকে দাতা বা অভিভাবক হিসেব গ্রহণ করা যাবে না। নবী কে যেমন তৎকালীন আরবের লোকেরা তাঁর বিশ্বস্ততায় আল আমীন উপাধি দিয়েছিল, তেমনি নবী (সাঃ) যখন লাত, মানাত উজ্জার মতো মূর্তি তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাস্য মানার বিরোদ্ধে এক আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দিলেন তখন তারাই তাদের এই প্রিয়তম ব্যক্তিটিকে মারধর করে বেহুশ করে ছাড়লো। এই হলো ঈমান আনা এবং ঈমানের দাওয়াত দানের পরিণাম। এভাবে এক পর্যায়ে নিজের বাড়ীঘর ছেড়ে প্রিয় নবীজীকে পাহাড়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। শিয়াবে আবু তালিবে তিনি আড়াই বছর কাটিয়েছেন। কতর্দূদশাগ্রস্থই  না ছিলো সেখানের সময়গুলো। এরপর সর্বশেষ নিজের জন্মভূমি, পৈতৃক ভিটা, নাড়ীর টান ছেড়ে একেবারে ভিন্ন এলাকায় হিজরতও করতে হয়েছে।
যে কোনো জায়গায় গিয়েও পৃথিবীর সর্বোত্তম মানুষের কল্যাণকামী এই মহান ব্যক্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। বিশ্বাসঘাতকতা করে ইহুদীরা প্রতারণা করছে। আবার আরবের কুরাইশাও রণ সজ্জায় সজ্জিত হয়ে আক্রমণ করতে এসেছে। এসবই হয়েছে আল্লাহর বাণীকে বুলন্দ করার জন্যই। নবীর (সাঃ)  অনুসারী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট মানুষগুলো সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) তাদের গোটা জীবনটাই নবীর সাথে কাটিয়েছেন। তারা পার্থিব সুখ, ধন সম্পদ, পিতামাতার স্নেহ ভালোবাসা সন্তানের মায়ার পিছুটান সব কিছুকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নবীজীর (সাঃ) সাথে একেবারে হিজরতও করলেন। সুতরাং এখনো যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং রাসূলের প্রতি ঈমান আনতে হয় তাহলে সেই রকম যুলুম নির্যাতনের শিকার হতেই হবে এটাই ইসলাম বিরোধীদের আচরণ।

স্বাধীনতা সংগ্রাম ঃ দেশে দেশে, যুগে যুগে -শাইখ মাহদী


একটি দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বের, মর্যাদার আর আবেগের বিষয়টি কি? একবাক্যে আমরা স্বীকার করে নেব, অবশ্যই স্বাধীনতা। আর তা যদি হয় রক্ত দিয়ে কেনা, তাহলে? সেই সংগ্রাম আর সংগ্রামী মানুষেরা চিরভাস্বর হয়ে বেঁচে থাকে সেই দেশের ইতিহাসে, মানুষের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে।
গৌরবময় এ স্বাধীনতার মাস - মার্চ। সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পর থেকে কেবল জুলুম আর পদে পদে নিপীড়ন, একাত্তরের মার্চের সেই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি আর তারই মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা, এই বাংলার খেটে খাওয়া নির্যাতিত মানুষের জীবনে এনে দিয়েছিল এক মৃত্যুঞ্জয়ী স্বপ্ন; যে স্বপ্নের বাস্তব রূপ ন’মাস পরে প্রতিভাত হয় সূর্যের আলোর চেয়েও উজ্জ্বলভাবে, এই বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির জন্ম হবার মধ্য দিয়ে। এ সংগ্রাম বড়ই গৌরবের, আর তাই শিল্পে, সাহিত্যে, সমাজের নানা স্তরে এমনকি রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির মাঝেও এ মহান সংগ্রামের চেতনার প্রয়োগ, অতিপ্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগ আমরা দেখে আসছি গত চল্লিশ বছর ধরে।
তবে এরকম গৌরবজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস বিশ্বের আরও অনেক দেশে রয়েছে, তবে সেগুলো সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান মোটামুটি সীমিতই বলা চলে। আজকে মহান স্বাধীনতার এ মাসে বিশ্বের আরও কিছু দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আমরা এখানে তুলে ধরব, যাতে করে ভ্রাতৃপ্রতিম এবং প্রতিবেশী বা সহযোগী দেশগুলোর আত্মদানের ইতিহাস, সে দেশের মানুষের আবেগ-ভালবাসা ও মনমানসিকতার উপর আমরা একটি স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারি।
প্রাচীনতম স্বাধীনতা সংগ্রাম: স্কটল্যান্ড
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামই সম্ভবত আমাদের জানা ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। দু’টি পর্যায়ে এ সংগ্রামটি সম্পন্ন হয়, যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ের স্থায়িত্ব হল ১২৯৬ থেকে ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দ আর দ্বিতীয়টি ১৩৩২ থেকে ১৩৫৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। যে মহান সংগ্রামী যোদ্ধার অধ্যাবসায় আর কঠোর পরিশ্রমের কথা আমরা সবাই জানি, সেই রবার্ট ব্র“স এই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম পর্যায়ে স্কটল্যান্ডকে মুক্তি দেন, আবার তাঁর পুত্র ও বংশধরেরাই স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বশেষ পর্যন্ত এর নেতৃত্ব দেন।
১২৯৬ সালে স্কটিশ রাজা ৩য় আলেক্সান্ডার তার অল্পবয়স্কা নাতনী মার্গারেটকে উত্তরাধিকারী রেখে মারা যান। স্কট সাম্রাজ্যের প্রভাবশালীরা তখন মার্গারেটকে ইংল্যান্ডের রাজা ১ম এডওয়ার্ড এর ছেলের সাথে বিয়ে দেয়। ক’মাস পর কোন কারণে মার্গারেট মারা যান এবং সুচতুর এডওয়ার্ড স্কটল্যান্ডকেও ইংলিশ রাজত্বের একটি অংশে পরিণত করেন। এর পরিপ্রেেিত শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম, ইংল্যান্ডের সাথে স্কটল্যান্ডের যুদ্ধ। বারংবার পরাজিত হয়েও রবার্ট ব্র“স কিভাবে তার রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন, সে গল্প আমরা সবাই জানি। ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্পাদিত এডিনবার্গ-নর্দাম্পটন চুক্তির মাধ্যমে এর একটি আপাত সমাপ্তি দেখা যায়।
তবে রবার্ট ব্র“সের মৃত্যুর পর আবারও ব্রিটেন তার চুক্তি ভঙ্গ করে স্কটল্যান্ডে আগ্রাসন চালায়। এক দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৩৫৭ সালে বারউইক চুক্তির মাধ্যমে স্কটল্যান্ড সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ আগ্রাসন মুক্ত হয়। এ সংগ্রাম মধ্যযুগের ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অস্ত্র হিসেবে ‘লং বো’ - বড় আকারের ধনুকের ব্যবহারও ঐ সময় শুরু হয়। ২৯টি বড় যুদ্ধ এবং চারটি চুক্তির সমন্বয়ে গঠিত এ সংগ্রামের স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ৫৭ বছর।
ডাচ বিদ্রোহ: স্বাধীনতাকামী নেদারল্যান্ডস
স্প্যানিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডসের স্বাধীনতা সংগ্রাম ইউরোপের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৫৬৮ সালে শুরু হওয়া এ বিদ্রোহ শুরু হয়। মূলত ১৫৫৬ সালে ডাচ রাজা চার্লস মারা গেলে তার পুত্র ২য় ফিলিপ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন, যার বাল্যকাল এবং শিাদীা সবই সম্পন্ন হয় স্পেনে। ফিলিপ সম্পূর্ণভাবে স্প্যানিশ ভাবধারায় আচ্ছন্ন ছিলেন এবং ডাচ ভাষায় কথা পর্যন্ত বলতে পারতেন না। এ বিদ্রোহ প্রাথমিকভাবে স্পেন চেপে রাখতে সম হয় ১৫৭২ সাল পর্যন্ত, কিন্তু এরপর তা নেদারল্যান্ডসের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ১৫৮৫ থেকে ১৬০৯ এ চব্বিশ বছরে খন্ড খন্ড ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হল বিদ্রোহীদের দ্বারা ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে আমন্ত্রণ জানানো, ডাচ সাম্রাজ্য অধিকার করার জন্য! এছাড়াও সুবিখ্যাত স্প্যানিশ নৌবহর আর্মাডা কে প্রতিরোধের জন্য ডাচ বিদ্রোহীরা শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলে। একই সাথে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠিত হয়, দূর প্রাচ্যে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করবার জন্য।
বিদ্রোহের মাত্রা যখন তুঙ্গে তখন স্প্যানিশ প বাধ্য হয় বিদ্রোহীদের সাথে একটি শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। যার মেয়াদ ছিল বারো বছর, ১৬০৯ থেকে ১৬২১ সাল পর্যন্ত। এরপরও বিপ্তি ঘটনাবলীর মাধ্যমে ডাচ উপনিবেশের বিভিন্ন এলাকা কার্যত স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে স্পেন মরণ কামড় দিতে ভোলেনি। ১৬৩৯ সালে ২০,০০০ সৈন্যের সমন্বয়ে একটি বাহিনী পাঠায় স্পেন, নেদারল্যান্ডসে এসে যা বিদ্ধস্ত হয়ে যায়। এরপর ১৬৪৮ সালে মুনস্টার চুক্তির মাধ্যমে স্পেন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, সমাপ্ত হয় আশি বছরব্যাপী দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম।
হৃত-রাজ্য পুনরুদ্ধার: পর্তুগালের স্বাধীনতা
পর্তুগালের সাম্রাজ্যে স্প্যানিশ আগ্রাসনের কারণে কিছুকালের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা হারায় দেশটি। ১৬৪০ সালে ব্রাগানসা রাজবংশের শাসনকালে এ স্প্যানিশ সম্রাট ফিলিপের আক্রমণ দেশের শাসকগোষ্ঠীকে পরিণত করে এক পুতুল সরকারে। স্পেনের এ ধরণের কার্যকলাপ ব্যতিব্যস্ত করে তোলে আশেপাশের রাজ্যগুলোকেও। তাই তৎকালীন ফরাসী সম্রাট ত্রয়োদশ লুইয়ের উপদেষ্টা কার্ডিনাল রিশালিও নিজেদের স্বার্র্র্থেই পর্তুগীজ শাসক চতুর্থ জোয়াও কে সাহায্য করবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৬৫৪ সালে জোয়াও এর সাথে ইংরেজ রাজা ক্রমওয়েলের একটি পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি সম্পন্ন হয়। পরের বছর জোয়াও মারা যান এবং তার ছেলে ষষ্ঠ আলফানসোর পে জোয়াওর স্ত্রী এবং আলফানসোর মা রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন।
তবে ১৬৫৯ সালে পিরেনিজ চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়ে যাওয়ায় চাপে পড়ে পর্তুগাল। তবে ১৬৬৫ সালের মন্টি-কার্লোতে সংঘটিত যুদ্ধে পর্তুগালের কাছে পরাজিত হয় স্পেন। পরবর্তীতে ১৬৬৮ সালে লিসবন চুক্তির মাধ্যমে পূর্ণভাবে স্বাধীনতা পায় পর্তুগাল, স্প্যানিশ আগ্রাসন তার থাবা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
হাঙ্গেরী - সংগ্রামী স্বাধীনতা:
ষোড়শ শতাব্দীতে তুরস্কের উসমানিয়া খিলাফতের অধীনে আসে হাঙ্গেরী। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হন বিদ্রোহী নেতা ইমরে থকোলী, যার হাত ধরে পোলিশ হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের হাত থেকে মুক্তি পায় হাঙ্গেরী। তবে সতেরো শতকের মাঝামাঝিতে পুনরায় হাঙ্গেরী দখল করে নেয় স্পেন, আর এই হাঙ্গেরীকে পুনরায় স্বাধীনতা দিতে এগিয়ে আসেন অভিজাত সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ফ্রান্সিস রাকোজ্জি। তার নেতৃত্বে শাসকগোষ্ঠীর বিপে সশস্ত্র সংগ্রামে এগিয়ে আসে বিদ্রোহীরা। হাঙ্গেরীয়ান অভিজাত ও নেতৃস্থানীয় সমাজ রাকোজ্জিকে প্রিন্স উপাধিতে ভূষিত করে। তবে ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যস্থতায় রাকোজ্জি এবং শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হয় ১৭০৫ সালে।
তবে ১৭০৮ সালে ট্রান্সেইন যুদ্ধের এক পর্যায়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়েন রাকোজ্জি, আর তাকে মৃত ভেবে হীনবল হয়ে পালিয়ে যায় তার যোদ্ধারা। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৭১১ সালে পূর্ণভাবে স্বাধীনতা পায় হাঙ্গেরী।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: রক্তে কেনা স্বাধীনতা
বর্তমান পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ আমেরিকাও স্বাধীনতা পেয়েছে এক রক্তয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ কলোনীভুক্ত এ দেশটির এ সংগ্রাম শুরু হয় ১৭৭৫ সাল থেকে। এ সময় ব্রিটিশ অধিভুক্ত ১৩টি কলোনী (আজকের যুগের অঙ্গরাজ্য) বিদ্রোহ করে ইংল্যান্ডের বিপ।ে আমেরিকার সাদা মানুষেরাই ছিল এ বিদ্রোহের সংগঠক ও পরিচালক, যদিও তারা ছিল ব্রিটেন থেকে আগত। কালো দাস এবং রেড ইন্ডিয়ানরা ব্রিটেনকেই সমর্থন দেয়, এছাড়াও নাগরিকদের একটি বড় অংশই স্বাধীনতার যুদ্ধের বিরোধিতা করে। ঐতিহাসিকদের মতে একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন দেয় ৪০-৪৫% মানুষ, বিরোধিতা করে ১৫-২০% এবং নিরপে থাকে ৩৫-৪৫% মানুষ। জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে এ সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে একে একে রক্তয়ী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে ম্যাসাচুসেটস, নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়াসহ আরও অন্যান্য রাজ্য। শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকার কারণে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ব্রিটেন তার অধিকার বজায় রাখতে পারলেও দেশের অভ্যন্তরভাগ, যেখানে ৯০% মানুষের বসবাস, সেখানে স্বাধীনতাকামীদের আধিপত্য ক্রমশ বাড়তে থাকে।
আমেরিকার এ স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে আমাদের এ উপমহাদেশের পরো কিছু সম্পর্ক রয়েছে। প্রথমত, আমেরিকায় সেনাসমাবেশ করতে গিয়ে অধিক সংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য প্রয়োজন হয়, সেই সৈন্য ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে গিয়ে মোতায়েন করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এ কারণে মহীশূরে টিপু সুলতান এবং ফরাসীদের মিলিত আক্রমণ প্রতিহত করতে বেগ পেতে হয় ব্রিটিশদের। এছাড়াও, আমেরিকায় স্বাধীনতাকামীদের বিপে ব্রিটিশ বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন লর্ড কর্ণওয়ালিস, যাকে পরবর্তীতে ভাইসরয় করে ভারতবর্ষে পাঠানো হয়।
স্বাধীনতাকামীদের অব্যাহত আক্রমণ এবং পরাজয়ের ফলে ১৭৮৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিস আত্মসমর্পণ করেন জর্জ ওয়াশিংটনের কাছে। এভাবেই জন্মলাভ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
অগ্নিগর্ভ দণি আমেরিকা ও সাইমন বলিভার: সংগ্রাম-বিপ্লবের লীলাভূমি
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম তিরিশ বছরে একের পর এক স্বাধীন হতে থাকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো। মূলত এ দেশগুলোর বেশিরভাগই ছিল স্পেনের কলোনী। এ দেশটিতে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট আক্রমণ করে সম্রাট ৭ম ফার্ডিন্যান্ডকে উৎখাত করেন, যার ফলে হাজার হাজার মাইল দূরের উপনিবেশগুলোর দিকে মনোযোগ দেবার মত সুযোগ তাদের ছিল না, এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে একে একে স্বাধীনতা অর্জন করে চিলি, মেক্সিকো, ভেনিজুয়েলা, কলাম্বিয়া, বলিভিয়া, ইকুয়েডর এবং উরুগুয়ে।
চিলি:
১৮০৮ সালে ফ্রান্সিসকো গার্সিয়া কারাসকো নামক এক অত্যাচারী ব্যক্তি চিলিয়ান উপনিবেশের গভর্ণর জেনারেল নিযুক্ত হন। তিনি দমন-নিপীড়ন ও নির্যাতনের এক স্টিম রোলার চালানো শুরু করেন। মূলত তার বিরুদ্ধেই আন্দোলন শুরু হয়, যা মোড় নেয় স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে। মাতিও ডি তোরো ই জাম্বেরানো নামক ৮৩ বছর বয়স্ক এক প্রভাবশালী সৈনিকের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম এ বিদ্রোহ শুরু হয় ১৮১০ সালে। পরবর্তীতে জোসে মিগুয়েল ক্যারেরা নামক এক সুচতুর উচ্চাভিলাসী যুবক নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে মতার মঞ্চে আরোহণ করেন। চিলি সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনতা অর্জন করে ১৮১৮ সালে।
মেক্সিকো:
স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে ১৮১০ সালে, মিগুয়েল হিদালগো ই কসটিলার হাতে। তাকে ১৮১১ সালে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। তার পর বিদ্রোহীদের নেতা হন জো মারিয়া মোরালেস, তার নেতৃত্বে ১৮১৩ সালে মেক্সিকোর স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে অবশেষে ১৮২১ সালে কর্ডোভা চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে মেক্সিকো।
ভেনিজুয়েলা:
স্পেনের অন্তর্গত কলোনী ভেনিজুয়েলা ১৮১১ সালে সর্বপ্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে। মহান বিপ্লবী সাইমন বলিভারের প্রত্য তত্বাবধানে থেকে রক্তয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ১৮২১ সালে স্বাধীন হয় দেশটি।
কলাম্বিয়া:
কলাম্বিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় ১৮১৫ সাল থেকে। নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যেতে থাকে দেশটি, যার মধ্যে বুয়্যাকা যুদ্ধটি প্রণিধানযোগ্য। এ যুদ্ধে সাইমন বলিভার ৩০০০ সৈন্য নিয়ে আন্দিজ পেরিয়ে আক্রমণ করেন এবং জয়ী হন। ১৮২০ সালে সশস্ত্র আক্রমণের মাধ্যমে রাজধানী বোগোটা মুক্ত হয়। স্বাধীন কলাম্বিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন সাইমন বলিভার।
ইকুয়েডর:
আশেপাশের সকল দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাপ ইকুয়েডরেও এসে লাগে। ১৮২২ সালের ২৪ মে জেনারেল অ্যান্টোনিও জোসে ডি সুক্রে আক্রমণ চালিয়ে দখল করে নেন রাজধানী কুইটো।
বলিভিয়া:
ঔপনিবেশিক শক্তির বিরেুদ্ধে দেশটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১৮০৯ সালে। রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পচিঁশ বছর পর ১৮২৪ সালের ৯ই ডিসেম্বর আয়াচুপে যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয় বলিভিয়া। তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ক এবং মহান বিপ্লবী সাইমন বলিভার এর নামে দেশটির নামকরণ হয় বলিভিয়া।
উরুগুয়ে:
১৮১১ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু হয় স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে। জোস গার্বাসিও আর্টিগাস এ আন্দোলনের অগ্রদূত। তবে স্প্যানিশ উপনিবেশের কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে ১৮২১ সালে ব্রাজিলের অংশ হিসেবে যুক্ত হয় উরুগুয়ে, যেখান থেকে আবার স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেশটি। অবশেষে ১৮২৮ সালে মন্টিভিডিও তে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে উরুগুয়ে স্বাধীনতা লাভ করে।
গ্রীসের স্বাধীনতা: উসমানিয়া খিলাফতের ভাঙ্গন
১৮২১ সালে গ্রীস প্রথম এলাকা হিসেবে তুর্কী খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আলেক্সান্ডার ইপসিলান্টিস এর নেতৃত্বে স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে এ সংগ্রাম শুরু হয়। একে একে ক্রীট দ্বীপ, মেসিডোনিয়া সহ গ্রীসের বিভিন্ন এলাকায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৮৩২ সালে কন্সট্যান্টিনোপল চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে গ্রীস। এ দেশটির স্বাধীনতা ইতিহাসের পাতায় একটি তাৎপর্য্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা এর মাধ্যমেই উসমানিয়া খিলাফতের ভাঙ্গনের সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সিপাহী বিদ্রোহ: উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার
আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ। ভারতের উত্তরাংশের বিভিন্ন প্রদেশে চলা এ বিপ্লব কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ রাজের সাম্রাজ্যের ভিতকে। ১০ই মে বাংলার ব্যারাকপুরে শুরু হওয়া এ বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষজুড়ে। মুঘল সম্রাট ২য় বাহাদুর শাহ জাফরকে কেন্দ্র করে কানপুরের নানা সাহেব, ঝাঁসির রাণী লীবাঈ ও আরও অনেক শাসক ঐক্যবদ্ধ হয়ে যোগ দিয়েছিলেন এ সংগ্রামে।
মূলত ব্রিটিশদের অব্যাহত শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত ােভ, নানান ধর্মীয়-সামাজিক কারণ এবং সর্বশেষে ‘এনফিল্ড প্যাটার্ণ ১৮৫৩’ রাইফেলের প্রচলন এ আগুনকে উস্কে দেয়। দাঁতে কেটে টোটা ব্যবহারের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হওয়ায় গুজব রটে যে, এতে গরু এবং শুকরের চর্বি ব্যবহৃত হয়েছে। যার ফলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের সৈন্যদের মনেই তীব্র অসন্তোষ জেগে ওঠে। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চে ৩৬ বিএনআই কোম্পানির মঙ্গল পান্ডে নামক এক সিপাহী ঐ কোম্পানীর জমাদার ঈশ্বরীপ্রসাদের সঙ্গে পরামর্শ করে বিদ্রোহের সূচনা করে। শেখ পল্টু নামক একজন সিপাহী ছাড়া সকলেই তাদের সমর্থন করে। তবে ব্রিটিশ সেনারা সহজেই এ বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করে, মঙ্গল পান্ডে ও ঈশ্বরীপ্রসাদের কোর্ট মার্শাল করে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় এবং শেখ পল্টু জমাদারের পদে উন্নীত হয়।
তবে পরবর্তী পর্যায়ে বিদ্রোহ চূড়ান্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে কর্ণেল মুনরো ও অন্যান্য ব্রিটিশ অফিসারের চেষ্টায় এবং কিছু বাস্তব সমস্যার কারণে, মূলত যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এ বিদ্রোহ ব্যর্থতা পর্যবসিত হয়। তবে এটুকু লাভ হয় যে, ভারতবর্ষের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি ব্রিটেনের রাণীর হাতে ন্যস্ত হয়।
এছাড়াও এ বিদ্রোহ পরবর্তীকালের সকল স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণাদায়ক ভূমিকা পালন করে। ২০০৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের দেড়শত বর্ষপূর্তি উদযাপন করা হয়।
রুমানিয়া: খিলাফতের ভাঙ্গন স্পষ্টতর
১৮৭৭ সালের এপ্রিলে রাশিয়ার প্রত্য মদদে উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে রুমানিয়া, রাশিয়ার ১,২০,০০০ সৈন্যকে নিজ দেশে প্রবেশাধিকার দিয়ে। তুর্কী আক্রমণের বিরুদ্ধে এ বিপুল রুশ সৈন্যকে ঢাল হিসেবে রেখে ২১শে মে মিহেলি কোগালনিচেনিউ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যাতে রুমানিয়ান রাজপুত্র প্রিন্স ১ম ক্যারল অনুমোদন করেন। রুমানিয়া তখন থেকে তুর্কীদের কর দেয়া বন্ধ করে দেয় এবং সেই অর্থ যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে প্রদান করে। অব্যাহত চাপ ও সামরিক তৎপরতা চালানোর ফলে ১৮৭৮ সালে সান স্টেফানোতে শান্তিচুক্তি হয়, এর মাধ্যমে রুমানিয়া স্বাধীনতা পায়।
আয়ারল্যান্ড: রক্তাক্ত অভ্যুদয়
ব্রিটিশ রাজত্বের হাত থেকে মুক্তি পেতে আয়ারল্যান্ডে তৎপরতা শুরু হয় ১৯১৯ সালে। এ সময় আইরিশ পার্লামেন্ট একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে কাজ শুরু করে, যার নাম দেয়া হয় ড্যালিল ইরিয়ান। এই ড্যালিল এর প্রত্য তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি (ওজঋ), যা সামরিক তৎপরতা শুরু করে। মাইকেল কলিন্স ছিলেন এর উদ্যোক্তা। এ সংগঠন তাদের গুপ্ত হামলার ল্যবস্তুতে পরিণত করে জওঅ কে, যারা ছিল রয়াল আইরিশ কনস্ট্যাবুলারি অর্থাৎ ব্রিটিশ অনুগত পুলিশ বাহিনী। অসংখ্য হত্যাকান্ডের পর ওজঋ গঠন করে ওচঋ - আইরিশ পুলিশ ফোর্স এবং স্থবির হয়ে পড়া ব্রিটিশ আদালতকে প্রতিস্থাপিত করে ড্যালিল কোর্ট দ্বারা। আর্থার গ্রিফিথকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেয় ওজঋ. অব্যাহত গুপ্তহত্যা ও রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯২১ সালে অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তির মাধ্যমে ইংল্যান্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে আয়ারল্যান্ড। অবশ্য এর পরপরই এক রক্তয়ী গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে দেশটির উত্তর ও দনি অংশ, আর এর বলি হন মাইকেল কলিন্স, আর্থার গ্রিফিথ।
বিংশ শতাব্দীর আরও কিছু স্বাধীনতা সংগ্রাম:
১৯৫৪ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় আলজেরিয়ায়, আধিপত্যবাদী ফ্রান্সের কবল থেকে থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য। অত্যন্ত নৃশংস ভূমিকা এখানে গ্রহণ করে দু’টি পই। তবে সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ১৯৬০ সালে স্বাধীন হয় আলজেরিয়া। এছাড়াও ১৯৬১ সালে পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম শুরু করে অ্যাঙ্গোলা, স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৭৪ সালে এলভোর চুক্তির মাধ্যমে।
এভাবেই যুগে যুগে স্বাধীনতা আন্দোলনে রক্ত ঝরিয়েছে পৃথিবীর বহু দেশের মানুষ। আর এখনও ফিলিস্তিন, কাশ্মীরসহ আরও অনেক দেশে চলছে রক্তাক্ত সংগ্রাম। যেহেতু একটি গৌরবময় স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তরাধিকারী আমরা, সে কারণে চলমান সকল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিও আমাদের সকলের শ্রদ্ধা থাকা উচিত। অত্যাচারী ও ঔপনিবেশিক শক্তির কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে একবিংশ শতাব্দির সকল সংগ্রামী মানুষেরা পাবে মুক্ত জীবনের স্বাদ, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্ন - এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
লেখক: শিার্থী, ঢাবি, আইন বিভাগ


বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের বর্ণিল উদ্বোধন ঃ একটি কাপের জন্য লড়ছে ১৪টি দল -মফিজুর রহমান


ক্রিকেটের মহাযজ্ঞের মহা আয়োজনের সূচনালগ্নে ঐতিহাসিক নগরী ঢাকা বিশ্বকে স্বাগত জানাল দু’হাত প্রসারিত করে। ঢাকা সেই রস-রূপ ফুটিয়ে তুলল পরম লালিত্যে, নান্দন্দিকতায়। দৃশ্যটা অনভ্যস্ত। অভিনবত্বও বটে। রিকশায় বসে আছেন রিকি পন্টিং। কোনটাতে গ্রায়েম স্মিথ, ড্যানিয়েল ভেট্টোরি কিংবা অ্যান্ড্র- স্ট্রাউস। ঢাকার আদিবাহনে চড়ে একে একে তারা প্রবেশ করলেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। যেন ক্রিকেটের বৈশ্বিক-গৃহপ্রবেশ হল। আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১১-র বর্ণিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের এটিই সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং চিত্তাকর্ষক অংশ। গৌরবে-সৌরভে, রঙে-রূপে, আলোয়-আনন্দে মোহনীয় এক সন্ধ্যা আড়াই ঘণ্টা আবেশে বুঁদ করে রাখে ক্রিকেটবিশ্বকে। শিল্প ব্যাংকের ভবনে টানানো বিশাল পর্দায় ভেসে ওঠে যখন ফুটে ওঠে ছয় বলের এক ওভার, চার-ছয় মারার অনুপম দৃশ্য, ক্রিকেট তখন সত্যি যেন বৈশ্বিক হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান ভাষা আন্দোলনের মাসে ভাষা শহীদ ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে ছয় সপ্তাহের ক্রিকেট বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এ অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। সুসজ্জিত ও হাইড্রলিক পদ্ধতির মঞ্চে ইবরার টিপু সহশিল্পীদের নিয়ে গাইলেন স্বাগত সঙ্গীতÑ ‘ও পৃথিবী এবার এসে ঃ বাংলাদেশ নাও চিনে, ও পৃথিবী ঃ তোমায় স্বাগত জানাই এই দিনে। তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলান মিলা, কণা, এলিটা, বালাম, হƒদয় খান ও অর্ণব। ৪০ জন যন্ত্রশিল্পী ছিলেন সঙ্গে। এর পরই সেই চমৎকৃত কোলাজÑ ১৪ রিকশায় বসে ১৪ অধিনায়কের প্রবেশ। তাদের প্রত্যেকের পাশে শিশু। সবচেয়ে বেশি তালি পড়ল সাকিবের বেলায়। সবার আগে একটি রিকশা-ভ্যানে ছিল বিশ্বকাপের মাসকট স্টাম্পি। মাঠ প্রদণি শেষে ১৪ অধিনায়ক মঞ্চে দাঁড়ান পাশাপাশি। এরপর সনু নিগমের থিম সঙ্গীতের সঙ্গে চলে আতশবাজির খেলা। অনুষ্ঠানে তিন দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ-পর্বে ফুটিয়ে তোলা হয় পলিমাটির আবহমান বাংলার কোমল সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য।
কানাডার জনপ্রিয় পপ গায়ক বহুবার গাওয়া শ্রোতা-জয় করা গান ‘সামার অব সিক্সটি নাইন’ গেয়ে শোনান। সবশেষে বলিউড সুরকারত্রয়ী শংকর-এহসান-লয় থিম সঙ গাইলেনÑ ‘দে ঘুমাকে ঃ’। আতশবাজির রোশনাই ছড়িয়ে শেষ হয় স্মরণীয় সন্ধ্যা। অন্যদিকে নিজেদের আঙিনায় এমন বিরল অনুষ্ঠান দেখা থেকে হাজার হাজার দর্শক বঞ্চিত হয়েছেন আয়োজকদের ঔদাসীন্য ও গাফিলতিতে। টিকিট কেটেও তারা মাঠে ঢুকতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের আশপাশে বড় পর্দায় অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা না করায় অনেকে ব্যর্থ-মনোরথে ফিরে যান। অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে আতশবাজির আলো দেখিয়ে সান্ত্বনা দেন। এর মাধম্যে পর্দা উঠল দশম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের। এ সময় আতশবাজির আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হয় গোটা এলাকা। এত বড় মাপের ক্রীড়া আয়োজন বাংলাদেশে আগে কখনো হয়নি। সেদিক দিয়ে ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সহ-আয়োজক দেশ হিসাবে নতুন ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ।
ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ২০১১ সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন আমাদের অভিভূত করেছে। বর্ণিল এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতি,ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষ উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির উপস্থাপন এদেশীয় ক্রিকেটকে নতুন পরিচয় করে দিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুষ্ঠানে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে আমাদের ক্রিকেটকে দেশে ও দেশের বাইরে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ক্রীড়া আসর দশম বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১-এর শুভ উদ্বোধন বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে প্রত্য করেছে অনন্য-অপূর্ব লাল-সবুজের বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের পর এমন বড় আনন্দের দিন আর কখনো আসেনি। সার্বিকভাবে ৩০ ল মার্কিন ডলারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ছিল আবহমান বাংলাসহ উপমহাদেশের স্বকীয় ও গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্মারক।
ইতিহাসের সাী হলেন দেশের কোটি কোটি দর্শক
জনস্রোতের মতো চারদিক থেকে আসছিলেন দর্শক। নারী পুরুষ, ছোট ছেলেমেয়ে কেউ যেন বাদ যাচ্ছিলেন না। বেলা চড়া হওয়ার সাথে সাথে শাহবাগ মোড় থেকে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। মতিঝিল দৈনিক বাংলার মোড় থেকে প্রবেশ পথ বন্ধ করা হয়। জিরো পয়েন্ট ছিল বন্ধ। তারপরও পায়ে হেঁটে টিকিট হাতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দর্শকরা লম্বা লাইন দিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করার জন্য যে উৎসাহ- উদ্দীপনা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তা ছিল লণীয়।
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চারদিক ঘিরে ছিল দর্শক আর দর্শক। যারা বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ম্যাচ দেখার টিকিট পেয়েছিলেন তারা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের টিকিট পেয়ে বাড়তি সুযোগ গ্রহণ করেছেন। ১ হাজার, ১০ হাজার, ২০ হাজার টাকা একটি টিকিট মূল্য। টিকিট পাওয়া অভিজাত পরিবার থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য, এইসব ভাগ্যবান দর্শক ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে ইতিহাসের সাী হতে এসেছিলেন।
এদিকে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে অব্যবস্থাপনা ছিল গ্যালারির আসন ব্যবস্থাপনা নিয়েও। দর্শকরা কিভাবে কোথায় যাবে, তার জন্য কোনো ভলান্টিয়ার না থাকায় দর্শকরা স্টেডিয়ামে এসে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। টিকিট হাতে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করেছেন। তারপরও সান্ত্বনা আছে অনেক, আত্মতৃপ্তি আছে অনেক। নিজেদের মাঠে বিশ্বকাপ বলে কথা। যারা টেলিভিশন দেখছেন তারাও খুশি, আবার যারা স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছেন তারাও খুশি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপভোগ করে ইতিহাসের সাী হলেন বাংলাদেশের কোটি কোটি দর্শক।
বিশ্বকাপে জয় পেতে শুরু করেছে টাইগারা : বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতবে একদিন, এই বিশ্বাস গেঁথে গেছে ক্রিকেটপ্রেমীদের হƒদয়ে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী ভারতের সঙ্গে হেরে কিছুটা নার্ভাস হয়েছিলো বাংলার টাইগারা। তবে ২য় ম্যাচে স্মরণীয়  জয়ের মাধ্যমে সে নাভার্সভাব কেটে যায়। ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা ভুলিয়ে বাংলাদেশকে অবিস্মরণীয় জয় উপহার দিলো টাইগার বোলাররা। দেশের সব ক্রিকেট অনুরাগীকে উৎসবে ভাসিয়ে দেয়ায় শুভেচ্ছা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সবাইকে। পুরো ম্যাচ জুড়েই অসাধারণ ফিল্ডিং করেছে দল। ম্যাচের দ্বিতীয় পর্বে দলীয় নৈপুন্যের নান্দনিক প্রদর্শনী ক্রিকেট অঙ্গনে টাইগারদের গৌরবময় পদচারণার ইঙ্গিত বহন করে। তবে এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। আশা করি, সামনের ম্যাচগুলোয় ২০৫ রানের টার্গেটে জয়লাভ টাইগারদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি সতর্কও করবে। স্বাগতিক দলের ওপর প্রত্যাশার চাপ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে বিশ্বকাপের মতো আসরে ব্যাটসম্যানদের এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অমনযোগী ব্যাটিং কাম্য নয়। ১৬ কোটি বাংলাদেশির হাত দু’পাশ থেকে আগলে রাখল একটি আশা। তা হলো বাঙালির বিশ্বকাপের আশা।
কে না চায় বিশ্বকাপ জিততে
আফ্রিদী, সাকিব, রিকি পন্টিং, কুমারা সাঙ্গাকারা, মাহেন্দ্র সিং ধোনি প্রত্যেকের চোখে এখন ভাসছে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সারাদেশে যে উন্মাদনা বইছে, ১৪ দলের অধিনায়কদের নিয়ে আইসিসির মিডিয়া সেশনে সেই উন্মাদনার ছোঁয়া টের পাওয়া গেল আরেকবার। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতেই সব দেশকে নেতৃত্ব দেয়া ক্যাপ্টেনদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো বিশ্বকাপ জেতার অঙ্গীকার। পন্টিং, সাঙ্গাকারা, ধোনিদের সেই প্রতিশ্রুতির সাথে তাল মেলালেন বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়ক সাকিবও। সাকিবের এমন সাহসী কথা অবশ্য বাকি অধিনায়কদেরও কিছুটা হলেও চমকে দিয়েছে। বিশ্বকাপ না জেতার আফসোস সেই ২৮ বছর ধরে। সবকটি টুর্নামেন্টে ফেভারিট হিসাবে অংশ নিলেও বিশ্বকাপ জেতা হয়নি তাদের। স্বাভাবিকভাবে এবার তাদের সম্ভাবনা অনেক বেশি। এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তান, ভারত বা শ্রীলংকার বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা বেশি, অন্তত ধোনি কিংবা সাঙ্গাকারার কাছে অংকের হিসাবও বেশ সহজ। এই টুর্নামেন্টেও ভালো লড়াইয়ের প্রত্যাশা করছেন স্মিথ যেমন, তেমনি পাকিস্তান অধিনায়ক আফ্রিদিও। কন্ডিশনের সাথে অবশ্য এখনো লড়াই করে যাচ্ছে ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ একটি, লড়বে ১৪টি দল। সারা দুনিয়া কাঁপানো টুর্নামেন্টে কেউ কোন ছাড় দিবে না, ছাড় দিবে না একচুলও। ১৪ দলের অধিনায়করা একসারিতে আনন্দে ভাসলেও তারা লড়বেন, নিজেদের জন্য, নিজের দেশের জন্য। কারণ, জয় করতে হবে বিশ্বকাপ।
এবার কে জিতিবে বিশ্বকাপ? এ ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। শক্তির বিচারে বলতে গেলে এবারকার আসরে কোন একক ফেভারিট নাই। আছে ফেভারিটস অর্থাৎ কয়েকটি শক্তিশালী দলের সম্ভাবনা। এবারের আসরে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান ডার্কহর্স। উপমহাদেশের মাটিতে শ্রীলংকাও বেশ শক্তিশালী। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও দণি আফ্রিকার সম্ভাবনাও অপরিসীম।
উল্লেখ্য যে, ক্রিকেটের সর্বোচ্চ এ আসরটি এবার ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের হিসাবে এটি দশম আসর যাতে অংশ নিচ্ছে ১৪টি দল। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপটির দায়িত্ব পাওয়ার সময় পাকিস্তানও ছিল এর অন্যতম যৌথ আয়োজক। কিন্তু ২০০৯ সালে পাকিস্তানের লাহোরে সফরকারী শ্রীলংকা দলকে বহনকারী বাসে সন্ত্রাসীরা আক্রমণ চালালে ৪৯ ম্যাচের এ বিশ্বকাপটির সহআয়োজনের অধিকার তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় ক্রিকেটের বিশ্বসংস্থা আইসিসি। এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আটটি, ভারত ২৯টি ও শ্রীলংকা ১২টি খেলার আয়োজন করছে।

কবিতা

আমাদের স্বাধীনতা
আবুল হোসেন আজাদ 

এইযে আমার জন্মভূমি
মায়ের মত আপন
এর বুকে তাই সুখে দুখে
আমার জীবন যাপন।
একাত্তরে অস্ত্র হাতে
নিয়েছিলাম তুলে;
করেছিলাম যুদ্ধ ন’মাস
বাঁধা ও ভয় ভুলে।
তাইতো পেলাম স্বাধীনতা
প্রিয় স্বাধীন দেশ;
চোখ জুড়ানো রূপের বাংলাদেশ
শপথ নিলাম আমার দেশের
স্বাধীনতার জন্য-
প্রয়োজনে লড়বো আবার
করবো না কার্পণ্য।
আমার দেশের স্বাধীনতা
দেবোনা ফের কারো
গড়তে এদেশ যার যা কাজে
মন দেবো যে আরো ।

অবাক প্রকৃতি
আবু জাহিদ

কি মনোরম মেদিনী তোমার গড়া
অনেকে লিখেছে গান, কবিতা, ছড়া।
রম্য গগন তোমারি সৃজন,
সকল সৃষ্টিই করে তার তর্জন
অকান্ত শৈবালিনী চলে বহমান
তারই দয়াই শশী,বানু নিত্য চলমান
পয়োধির মাঝে আছে অনেক জীবের নাশ
জলধারার গর্জনে মেতে উঠে গগন
তারই মাঝে কখনও জ্বলে উঠে পবন।
পশ্চিম গগনে অস্তিমিত যখন তপন,
এই ধরণীর সবাই সবার যেন আপন
রজনীতে উদিত হয় যখন শশী
প্রকৃতির চারু তখনি হয় বেশি।
পাহাড় পর্বতে গেটে আছে ভূমি,
বৃষ্টিতে জলধরা করে তার শিরচুমি।
সব কিছুতেই বিদ্যমান স্রষ্টার পরিচয়!
সেই স্রষ্টার পরিচয় জানেই বা কয়জন।

শাপলা ফুলের কলি
নূর মোহাম্মদ

আকাশ ভরা গ্রহ তারা,
বিশ্ব ভরা দেশ
রূপে রসে গন্ধে ভরা
মোদের বাংলাদেশ।
সকল দেশের ফলের চেয়ে
কাঁঠাল সবার বড়;
সে তো মোদের জাতীয় ফল
গর্ব সবাই করো ।
পাহাড় নদী মাঠ পেরিয়ে,
সবুজ রঙের মেলা
হরেক রকম ফুলের সুভাষ
প্রজাপতির খেলা।
ভোর-বিহানে দোয়েল পাখি
শীষ দিয়ে যায় যখন
কৃষক জেলে আপন মনে
কাজে নামে তখন।
গ্রাম বাংলা নদীর জলে
বাংলাদেশের শান
বৈঠা ভাঙ্গা পানির হাসি
মাঝির কন্ঠে গান।
এ দেশেতেই জন্ম আমায়
গর্ব করে বলি;
এ হৃদয়ে ফুটে যখন
শাপলা ফুলের কলি।

সপ্নপুরী
সাবিনা আকতার সুমা

ছোট্ট একটা দ্বীপের মাঝে আমার ছোট বাড়ি,
সুখ দু:খের দিনগুলোকে নিত্য যে দেই পাড়ি,
জল তরঙ্গের সমুদ্রটা হারায় অচিনপুরে,
মাল্লামাঝি নৌকা নিয়ে যায়যে অনেক দূরে।
কয়েকজনে পাল্লা দিয়ে দাড়ের নৌকা টানে,
কেহ আবার মনটা মাতায় হরেক সুরের গানে।
ছোট্ট্র ছেলে মনের সুখে পাতার বাশি বাজায়,
কুমার বাড়ি মাটির হাড়ি রং বেরঙ্গে সাজায়।
পানির বুকে রাজহাসেরা টেউয়ের তালে ভাসে,
ঘাসের ডগায় ভোরের শিশির মুক্তা হয়ে হাসে।
আকাশ মাঝে তপ্ত সূর্য দেখায় খুশির খেলা,
আকাশ জুড়ে নৃত্য করে কাটায় সারা বেলা।
সন্ধাবেলা সূয্যি মামা পূব আকাশে ঢলে,
তখন সবার ঘরে ঘরে সন্ধাবাতি জ্বলে।

গভীর রাতে
(মরহুম বাবার স্মরণে)
সাফা ইসলাম

গভীর রাতে মুগ্ধ করা তারা পানে চেয়ে
কষ্টে আমার অশ্র“ুধারা ঝরে দু’গাল বেয়ে।
বাবার কথা পড়লে মনে আঁধারে ঢেকে যায়
শ্রাবণের বারিধারা যেন হৃদয়কে কাঁদায়।
বাবা আমার চলে গেছেন অনেক অনেক দূরে
তাঁর স্মৃতি আগলে বুকে রাখি যতন করে।
হৃদয়ে সব ভালবাসা  শুধুই যে তাঁর তরে,
যতই দূরে থাকোনা তুমি, আছ হৃদয় ঘরে।
ছোট্ট থেকে এই অবধি বুকের গহীন কোণে
ভালবাসার ঠাই দিয়েছ নিত্য সংগোপনে।
জানি আমি, যতই দূরে থাকোনা কেন তুমি
তোমার শুভ কামনা কবরে আমায় চুমি।
তাইতো আমি প্রভূর কাছে তুলে দু’টি হাত
তোমার জন্য প্রতি রাতে চাই যে মাগফিরাত।

প্রতিজ্ঞা
রফিকুল ইসলাম

জন্ম আমার স্বাধীন দেশে
স্বাধীনভাবেই চলতে চাই
এদেশেতে নিত্য কেন
সন্ত্রাসীদের হচ্ছে ঠাই?
দিন দুপুরে মা বোনদের
করছে কত নির্যাতন
আমরা কিশোর সাধু সেজে
রইবো কেবল অচেতন?
না, না, না এ হবেনা
কিশোর  মনের  প্রতিজ্ঞা
বাহুবলে সব দূর করিব
না মানিব নিষেধাজ্ঞা
বজ্র বেগে চলবো এগে
সকল বাধাঁর অন্ত টানি
আপন হাতে মুছে দেব
অভাগাদের দু:খ গ্লানি
প্রেমের পরশ আনব দেশে
দূর করে সব অত্যাচার
হৃদয়পটে লিখে নেব
বাংলা আমার অহংকার।