রবিবার, ৩ এপ্রিল, ২০১১

বিজ্ঞানে ধাঁধাঁ, গণিতে মজা !! সোহাগ হাসান হৃদয়

গণিতের রাজ্য বিশাল সুবিস্তৃত। আজ আমাদের কাছে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক যেমন ছড়িয়ে আছে, তেমনি গণিতের সু-বিশাল রাজ্য আমাদের সামনে, পিছনে, উপরে, নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সামান্য কিছু হয়তো আমাদের জানা বাকী অংশ আমাদের অজানাই রয়েছে। জল ডুবরীরা মাঝে মাঝে বলে থাকে সমুদ্রের  অথৈ পানির নিচের অধিকাংশ বিষয়ই আমাদের অজানা গণিতের রাজ্য ঠিক তেমই আমাদের কাছে অজানা রয়েছে। যদিও আজ অনেক জটিল রহস্যই মেঘের মতো হয়ে যাচ্ছে। সে যাই হোক অজানা সামান্য কিছু অংশ অনেক জ্ঞানী প্রবীন গণিতের পণ্ডিতরা জানার চেষ্টা করেছেন। বেরিয়ে এসেছে জানা-অজানা রহস্য। আজ হয়তো তাদেরই অক্লান্ত পরিশ্রমের বদৌলতে আমরা গণিতের অনেক অসাধ্য কঠিন কাজ সহজ ভাবে বুঝতে পেরেছি। বুঝেছি গণিতের রাজ্য কত বড়, কত সুন্দর, চমকপ্রদ রহস্যময়!!

গণিত নিয়ে গবেষণা অনেক পূর্বে থেকে চলে আসছে। গণিত নিয়ে গবেষণা আছে, ভবিষ্যতে চলবে। আমি আজ গণিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করবো না বরং গণিত নিয়ে পূর্ব থেকে চলে আসছে কিছু চমকপ্রদ ধাঁধার কথা বলব, এর অধিকাংশ অনেকেরই হয়তো জানা। কিছু লোক হয়তো জানেন না। তাদের উদ্দেশ্যে আমার এই লেখা। যদি তারা এরকম ধাঁধা জেনে নিজের মেধাকে সমৃদ্ধ করতে পারেন।

প্রথমেই তিন অঙক বিশিষ্ট তিনটি সংখ্যা লিখুন ঐ তিন অঙক বিশিষ্ট্য সংখ্য পূর্বের সংখ্যার পাশাপাশি আর এক বার লিখুন। লক্ষ্য করুন আপনার খাতায় ছয় অঙক বিশিষ্ট্য সংখ্যা হল। যেমন ধরুন ২৫৮ তিন অঙক বিশিষ্ট্য সংখ্যা এবার ২৫৮২৫৮ পূর্বের সংখ্যার পাশাপাশি লেখা হলো।

এই ছয় অঙক বিশিষ্ট্য সংখ্যাকে সাত দিয়ে ভাগ দিন দেখবেন ভাগশেষ থাকবে না। বরং সাত দিয়ে বিভাজ্য হবে। ঠিক একই ভাবে ফলাফলকে যথাক্রমে ১১ ও  ১৩ দিয়ে ভাগ দিলে আশ্চর্য হবার বিষয় দাড়াবে। সর্বশেষ যখন ১৩ দিয়ে ভাগ দেয়া হয়েছে, তাতে আপনার কাঙ্খিত সংখ্যাটি পেয়ে যাবেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই নিশ্চই পেয়েছেন প্রথম যে তিন সংখ্যা বিশিষ্ট সংখ্যা নিয়েছিলেন।

এবার আমার নেওয়া সংখ্যাটি দিয়ে বিষয়টি আরো স্পষ্ট করব। দেখুন ২৫৮২৫৮ সংখ্যাটিকে ৭ দিয়ে ভাগ দিলে পাওয়া যায় ৩৬৮৯৪ যাহাতে কোন ভাগ শেষ নেই। ঠিক একইভাবে ৩৬৮৯৪ সংখ্যাকে ১১ দিয়ে ভাগ দিলে পাওয়া যায় ৩৩৫৪ লক্ষ্য করুন এতেও কোন ভাগশেষ নেই। সর্বশেষ ১৩ দিয়ে ভাগ দিলেই তো ধাঁধাঁর রসহ্য উম্মেচন হয়ে যায় ৩৩৫৪গু১৩ = ২৫৮।
এভাবে আপনি বিভিন্ন সংখ্যা ৭, ১১ এবং ১৩ দিয়ে ভাগ দিলে প্রথম তিন অঙক বিশিষ্ট অজানা সংখ্যাটি বের করে দিতে পারে।

আরো একটি মজার গণিতের যোগ লক্ষ্য করুন যেখানে ০ থেকে ৯ পর্যন্ত প্রত্যেকটি সংখ্যা শুধুমাত্র  একবার ব্যবহার করে সম্পূর্ন করা হয়েছে।
৫৮৯
৪৩৭
১০২৬

লক্ষ্য করে দেখুন কোন অংকই ২ বার করে ব্যবহার করা হয় নাই।

নিচের এ রকম মাথা ঘামানো সহজ সরল কিছু ধাঁধা দিলাম যার উত্তর অনেকই জানেন। পাঠকের দায়িত্ব নিচের ধাঁধা গুলোর সম্ভাব্য ও সঠিক উত্তর শিক্ষাঙ্গন কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া। উল্লেখ্য যে, সঠিক উত্তর দাতাদের মধ্যে থেকে কোনও সৌভাগ্যবান গণিত ধাঁধা পি ত বিশেষ কোন পুরষ্কার পাবেন না।

একই অঙক আটবার (সর্বোচ্চ) ব্যবহার করে ১০০০ লিখতে পারেন কি?
০ থেকে ৯ পর্যন্ত দশটি অঙক ব্যবহার করে এই সহজ যোগটি পূর্ন করুন।
৮*৯
         + *** 
**০*
শুধু ৪ সর্বচ্চ ৮ বার অঙক ব্যবহার করে ১০০ লিখতে পারেন কি?
০ থেকে ৯ পর্যন্ত দশটি অঙক ব্যবহার করে গুনটি সম্পূর্ণ করুন।
*৯*
´*৫
**৮**
১ থেকে ৯ পর্যন্ত প্রত্যকটি অঙক একবার ব্যবহার করে গুণটি সম্পূর্ণ করুন।
১**
´*৮
**৩*ঢ়

পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধীকার প্রশ্নে নারী পুরুষের সমানাধিকার ঃ কিছু কথা -মোঃ আবু তাহের

লেখক : সাংবাদিক
পিতার সম্পদে নারী-পুরুষের সমানাধিকার দেয়ার প্রস্তাব রেখে “নারী উন্নয়ন নীতি’২০১১”এর খসড়া মন্ত্রীসভা অনুমোদন করেছে। গত ৭মার্চ’২০১১ তারিখে সচীবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রীসভার বৈঠকে এটি অনুমোদিত হয়। মন্ত্রীসভায় জাতীয় নারী নীতি’২০১১ এর যে খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে তাতে পারিবারিক, সামাজিক পর্যায় ও কর্মক্ষেত্রে সমানাধিকার নিশ্চিত করার ঘোষনা রয়েছে। উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রনের অধিকার রাখা হয়েছে।
এই আইনের ফলে এখন পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার হিসেবে ছেলে-মেয়ে সমান ভাগ পাবে। অর্থাৎ ইসলাম ধর্মে যে বিধান ছিল তা এখন লন্ড-ভন্ড হয়ে যাবে। কুরআনে বলা আছে মৃত পিতার সম্পত্তিতে মেয়ে যা পাবে তার দ্বীগুন পাবে ছেলে। অর্থাৎ একজন পিতার যদি একজন ছেলে আর দুইজন মেয়ে থাকে তাহলে দুইজন মেয়ে যা পাবে ছেলে একাই তা পাবে। কিন্তু এই নারী নীতি যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ই সমান অংশের ভাগ পাবে। অথচ কুরআনে সম্পূর্ণ এর বিপরীত বিধান দেয়া আছে। আর বর্তমান সরকার বলেছেন যে তাঁরা কুরআন বিরোধী কোন আইন করবেন না।
পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ১১ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন “আল্লাহ তায়ালা (তোমাদের উত্তরাধিকারে) সন্তানদের সম্পর্কে (এ মর্মে) তোমাদের জন্যে বিধান জারি করছেন যে, এক ছেলের অংশ হবে দুই কন্যা সন্তানের মতো, কিন্তু (উত্তরাধিকারী) কন্যারা যদি দু’য়ের বেশি হয় তাহলে তাদের জন্যে (থাকবে) রেখে যাওয়া সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ, আর (সে) কন্যা সন্তান যদি একজন হয়, তাহলে তার (অংশ) হবে (পরিত্যক্তসম্পত্তির) অর্ধেক, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্যে থাকবে (সে সম্পদের) ছয় ভাগের এক ভাগ, (অপর দিকে) মৃত ব্যক্তির যদি কোন   সন্তান না থাকে এবং পিতা-মাতাই যদি হয় (তার একমাত্র) উত্তরাধিকারী, তাহলে তার মায়ের (অংশ) হবে ছয় ভাগের এক ভাগ, (মৃত্যুর) আগে সে যে ওসিয়ত করে গেছে এবং তার (রেখে যাওয়া) ঋণ আদায় করে দেয়ার পরই (কিন্তু এসব ভাগ-বাটোয়ারা করতে হবে), তোমরা জানো না তোমাদের পিতা-মাতা ও তোমাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে কে তোমাদের জন্যে উপকারের দিক থেকে বেশী নিকটবর্তী, (অতএব) এ হচ্ছে আল্লাহর বিধান, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা সকল কিছু সম্পর্কে ওয়াকেফহাল এবং তিনিই হচ্ছেন বিজ্ঞ, পরম কুশলী।”
কুরআনের এই বিধানকে উপেক্ষা করে একটি মুসলিম দেশে যে নারী নীতি হতে যাচ্ছে তা যে কেউই মেনে নেবে না তা সরকারের বোঝা উচিত। কারন কুরআন সকল মুসলমানের অন্তরের সাথে সম্পর্কিত। এই আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে আবার হিতে বিপরীত না হয়ে যায় সেই চিন্তা সরকারের থাকা দরকার। সরকারের কেউ কেউ আবার বলছেন যে কুরআনের বিধানের সাথে এই আইন সাংঘর্ষিক নয়! অথচ তারা এর সঠিক কোন ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন না। ইতোমধ্যে তো এই আইনের প্রতিবাদে কোন কোন ইসলামী দল হরতালেরও ডাক দিয়েছেন, এরপরও যদি সরকার সঠিক ব্যাখা না দেন তাহলে দেশে যে সমস্যা তৈরী হবে এর দায়ভার কিন্তু সরকার কিছুতেই এড়াতে পারবেন না। তাই সরকারের উচিত হবে অতি দ্রুত একটা খোলা-মেলা সিদ্ধান্ত জনগনকে জানিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা।
উপরে যে কুরআনের আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে তাতে আল্লাহ স্পষ্ট করে উত্তরাধিকারের ব্যাপারে কথা বলেছেন। এখানে তার আর ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
এখন কথা হলো যেই আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করলেন তিনি মানুষের সমস্যা সম্পর্কে বেশি বোঝেন নাকি আমরা নিজেরাই নিজেদের ব্যাপার বেশি বুঝি। আমরা যদি আল্লাহর চেয়ে বেশি বা ততখানি বুঝতাম তাহলে নিত্য আইন পরিবর্তন করতে হতো না, এক আইন তৈরী করেই কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে রেখে দিতাম। যেহেতু মানুষের জ্ঞান স্বল্প এবং মানুষ সামনে যা আছে তাই নিয়ে চিন্তা করেই একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, ভবিষ্যতের কোন জ্ঞানই মানুষের নাই তাই সেখানে অনেক ভুল থেকে যায়, কয়েকদিন পরে সেটাকে বাতিল করে অন্য একটা আইন তৈরী করার জন্য উঠে-পড়ে লেগে যায়। কিন্তু আল্লাহ যেহেতু ভবিষ্যতেরও জ্ঞান রাখেন এবং তিনি কুরআনে যা লিখে দিয়েছেন তা সবসময়েই বর্তমান (অতিত বা ভবিষ্যৎ নয়) তাই তাঁর বিধান মত চললে সকল সমস্যারই সমাধান হতে বাধ্য। আল্লাহ কুরআনে যত কথাই বলেছেন তা সবই বিজ্ঞান সম্মত এবং আমাদের উপকারের জন্যই। এমন একটা বিষয়ও কুরআনে খুঁজে পাওয়া যাবে না যেটা আমাদের জন্য অপকারী বা ক্ষতিকর। আমরা হয়তো না বুঝে কুরআনের কিছু কিছু অংশের বিরোধীতা করে বসি, সেটা আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতা। আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতার জন্য তো আর কুরআনকে বা আল্লাহকে দোষারোপ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এই উত্তরাধীকারের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। আল্লাহ কুরআনে যেটা বলেছেন সেটা আমাদের উপকারের জন্যই বলেছেন যে দুই মেয়ের সমান এক ছেলে পিতার সম্পত্তির ভাগ পাবেন।
এখন আসুন একটু বিশ্লেষণ করে দেখি যে আল্লাহ যেটা বলেছেন তা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত (আমার ছোট্ট মাথায় যে চিন্তাটুকু এসেছে তার আলোকেই বলার চেষ্টা করছি)।
ধরুন আমার একজন বোন আছে অর্থাৎ আমার বাবার দুই ছেলে-মেয়ে। আমরা একসাথেই বড় হয়ে উঠছি। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমাদের বাবা আমাদেরকে লালন-পালন করেছেন, লেখা-পড়া শিখিয়েছেন, বড় করে তুলেছেন। এই সময়ের মধ্যে আমরা উভয়েই অনেকটা অসহায় ছিলাম বা বলতে গেলে পিতার উপর নির্ভরশীল ছিলাম। কিছুদিন পরে আমার বোনটির বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারনে সে শ্বশুর বাড়িতে চলে গেল। তার বিয়ের সময়ে সে তার স্বামীর নিকট থেকে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের দেনমোহর পেল, বাবার নিকট থেকে সোনা-রুপা যা পাওয়ার তা পেল, মায়ের নিকট থেকেও কিছু পেল আর আত্মীয়-স্বজনের নিকট থেকে অনেক উপঢৌকন তো পেলই। এরপর আমার বিয়েতে আমি আমার স্ত্রীকেও সেই একই নিয়মে নির্দিষ্ট অঙ্কের দেনমোহর দিলাম কিন্তু আমার বোনের মত কিছুই পেলাম না। যদি আমার বোন বিয়ের সময় পেয়ে থাকে সব মিলিয়ে ন্যুনতম দুই লক্ষ টাকা, সেখানে আমাকে উল্টো খরচ করতে হল দুই লক্ষ টাকা। এক্ষেত্রে আমি আমার বোনের চেয়ে ন্যুনতম দুই লক্ষ টাকা কম পেলাম, আর আমার বোন আমার চেয়ে পেল দুই লক্ষ টাকা বেশি।
এখন আমার বোন চলে গেল তার শ্বশুর বাড়িতে। আর আমি আমার স্ত্রী সহ থেকে গেলাম আমার নিজের বাড়িতে বা বাবার বাড়িতে। আমার বোন তার শ্বশুর বাড়িতে চলে যাওয়ার কারনে সে কিন্তু আমাদের পিতা-মাতার সকল দায়ভার থেকে মুক্ত হয়ে গেল আর আমার উপর সকল দায়ভার চেপে বসলো। এখন আমাদের পুরো সংসারটা আমাকেই দেখতে হবে। আমি যেহেতু আমার বাবার বাড়িতে থাকি সেহেতু বাবা-মার সকল প্রকার দেখাশোনা আমাকেই করতে হবে। কিন্তু বিনিময়ে আমি আমার বাবার নিকট থেকে আমার বোনের চেয়ে তেমন কিছুই বেশি পাব না। যা বেশি পাওয়ার তা হলো ঐ এক টুকরা জমি। আর বাবার যদি জমি না থেকে থাকে তাহলে তো আরও কঠিন অবস্থা। এ অবস্থা থেকে কিন্তু আমি আমার বাবা-মায়ের সেবা করা থেকে দূরে থাকতে পারবো না। আর এ অবস্থায় যদি আমার বোন আমাদের বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন তাহলে তার ও তার স্বামীর উপযুক্ত সেবা তো আমাকে করতেই হবে। অথচ এর বিনিময়ে আমাকে কিছুই দেওয়া হবে না। অর্থাৎ কোন বিনিময় ছাড়াই আমাকে তাদের সেবা করে যেতে হবে।
একদিকে আমাকে আমার পিতা-মাতার সার্বিক দিক দেখতে হচ্ছে, দেখতে হচ্ছে আমার স্ত্রী-ছেলে-মেয়েদের, আরও দেখতে হচ্ছে আমার ও আমার বোনের শ্বশুর বাড়ি থেকে আসা সকলের উত্তম সেবার ব্যাপারে। আর আমার বোনকে এগুলোর তেমন কিছুই দেখতে হচ্ছে না। যতটুকু দেখার তা দেখছে তার স্বামী। অর্থাৎ আমার বোনের বিয়ের পর সে সকল দায়-দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। আর আমার বিষয়টা তার সম্পূর্ণভাবে উল্টো। আমি সকল দায়ভারে যুক্ত। এরপরও কথা থেকে যায়। আল্লাহ না করুন কোন কারনে যদি আমার বোন তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা হয়ে যায় আর সে আমার বাড়িতে চলে আসে তাহলে তার সকল ব্যয়-ভার তো আমাকেই বহন করতে হবে। আর তার যদি কোন ছেলে-মেয়ে থেকে থাকে তাহলে তাদেরও দেখা-শোনার ভার আমার উপরই এসে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মজার বিষয় হলো এর জন্য আমি তাদের নিকট থেকে বিনিময়ে কিছুই পাব না।
এতক্ষন থেকে অনেক প্যাচালই পাড়লাম। এখন মূল কথায় আসি। সরকার যেহেতু আইন করতে যাচ্ছেন যে পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা ভাই বোন সম্পত্তির সমান অধিকার পাব, সেহেতু আমার বোনের বিয়ের পর সে তার শ্বশুর বাড়িতে যেতে পারবে না। কারন আমি একাই আমার বাবা-মায়ের সেবা করবো কেন। সম্পত্তির ভাগ আমি যা পেয়েছি সেও তাই পেয়েছে। অতএব বাবা-মায়ের সেবা সে যতটুকু করবে আমিও তাই করবো, বেশি করার তো কোন প্রশ্নই উঠে না। আমি যেভাবে কাজ-কর্ম করে আমার পিতা-মাতার দেখ-ভাল করবো, তেমনি আমার বোনেরও সেই একই ভাবে কাজ-কর্ম করে পিতা-মাতার দেখ-ভাল করতে হবে। আর সে যদি তার শ্বশুর বাড়িতে চলে যায় তাহলে কখনই আর সে আমার বাড়িতে আসতে পারবে না। আর আসলেও সাথে খাবার-দাবার নিয়ে আসতে হবে। আর সে যদি কখনও তালকপ্রাপ্তা বা বিধবা হয়ে যায় তাহলে পিতার নিকট থেকে পাওয়া সম্পত্তি ব্যবহার করার মাধ্যমেই সে তার সংসার পরিচালনা করবে, কখনই আমার বাড়িতে এসে উঠতে পারবে না। তার ছেলে-মেয়েদের দেখা-শোনার দায়িত্বও আমি নিতে পারবো না বা নিবো না।
এককথায় পিতার সম্পত্তিতে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা হলে ভাই-বোনের মধ্যে আর ভাল বলে কোন সম্পর্ক থাকবে না। বিশেষ করে পিতা-মাতার ইন্তেকালের পরে ভাই-বোনের সম্পর্কটা সম্পূর্ণরুপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বর্তমানে আমাদের সমাজ যত সুন্দরভাবে চলছে তখন আর এই সুন্দর স্বাভাবিকভাবেই থাকবে না। একজনের সাথে আরেকজনের সম্পর্ক হবে হিংসার। কেউ কারো ভাল দেখতে পারবে না। আমরা ভাই বোন উভয়ই চাইবো যে কাকে কতটুকু ঠকিয়ে বড়লোক হওয়া যায়। বলতে গেলে একটা অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে।
এছাড়া কুরআন বিরোধী এই আইন বাস্তবায়ন হলে আমার বোন আরও বেশি ঠকবে। আমার পিতা স্বাভাবিকভাবেই তখন তাঁর সম্পত্তি আমাকেই বেশি দেওয়ার চেষ্টা করবেন। কারন পিতা-মাতা যখন বৃদ্ধ হয়ে যাবেন তখন তাদের দেখা-শোনার জন্য আমাকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর যেহেতু আমি তাঁদের সেবা করবো আর আমার বোন তাঁদের কোন কাজেই আসতে পারবে না এবং পিতা-মাতা বুঝবেন যে মেয়েকে তো বিয়ে দিয়ে তার শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি, তাকে দেখা-শোনার দায়িত্ব তার স্বামীর কিন্তু আমার ছেলেকে তো দেখা-শোনার কেউ নাই তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার পিতা তার সম্পত্তিটা আমাকে লিখে দেওয়ার চেষ্টাই করবেন। এছাড়া আমিও চেষ্টা করবো কিভাবে আমার পিতার নিকট থেকে সম্পত্তিটা লিখে নেওয়া যায়। বোঝাই যাচ্ছে যে কুরআন বিরোধী এই আইন বাস্তবায়ন হলে আমাদের সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে যাবে।
এই আইন না করে যদি এমন আইন করতো যে, কুরআনে উত্তরাধিকার সম্পত্তি বন্টনের যে পদ্ধতি আল্লাহ বাতলে দিয়েছেন ঠিক সেভাবে সম্পদের বন্টন করতে হবে আর পিতা যদি ছেলেকে গোপনে বা ছেলে যদি পিতার নিকট থেকে জোর করে সম্পত্তি লিখে নেয় আর এটা যদি প্রমানিত হয় তাহলে কোন অবস্থাতেই তা ঠিক থাকবে না বরং সেটা অটোমেটিক বাতিল হয়ে গিয়ে কুরআনের আইন অনুয়ায়ী আবারও বন্টন করতে হবে। তাহলে আর কেউই তার বোনকে ঠকানোর সাহস করবে না। কিন্তু আমাদের সরকার করতে যাচ্ছেন সম্পূর্ণ উল্টোটা!
আল্লাহ যেহেতু আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন সেহেতু তিনিই জানেন যে কিভাবে কি করলে আমাদের চলার পথ সহজ হবে। সম্পত্তি কিভাবে বন্টন করলে কেউই ঠকবে না বরং সবাই সন্তুষ্ট থাকতে পারবে। এখন আমরা যদি সেই বন্টন নীতি বাদ দিয়ে আমাদের মনগড়া নীতি বাস্তবায়ন করতে যাই তাহলে তো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবেই। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, যে বা যারাই আল্লাহর কথামত চলবেন তারাই শান্তিতে থাকতে পারবেন। আর যারা আল্লাহর কথামত চলবেন না তারা অশান্তিতেই থাকবেন। আল্লাহর কথামত চলার কারনে সাগর-নদীতে বা বনে-জঙ্গলে অথবা আসমানের কোটি কোটি নক্ষত্রের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। তারা সকলেই আল্লাহর কথামত নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সু-শৃঙ্খল ভাবেই দিনাতিপাত করছে। আমরাও যদি আমাদের আল্লাহর দেওয়া বিধান কুরআনুল কারীম অনুযায়ী চলি তাহলে আমরাও সুখে-শান্তিতে যে থাকতে পারবো তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। অতএব সরকারের উচিত এমন আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে কুরআনের বিধানকেই বাস্তবায়ন করা। এমন চিন্তা শুধু আমি নই বরং সরকারের ভিতরে বা বাইরে অর্থাৎ বর্তমান ও সাবেক অনেক কর্ম-কর্তারাও মনে করছেন। তারা স্পষ্ট করেই বলেছেন যে সরকার কুরআন বিরোধি এমন কাজ করলে খুব বড় ধরনের ভুলই করবেন।
কিছুদিন পূর্বে একটি জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ সরকারের একজন সাবেক সচিবের একটা লেখা ছেপেছিলেন। সেখানে সেই সচিব সরকারের এই আইনের অসাড়তা তুলে ধরে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে এই আইন বাস্তবায়ন হলে মেয়েরাই বেশি ঠকবে। আর কুরআনের আইন বাস্তবায়ন হলে মেয়েরাই জিতবে। তাঁর লেখার শিরোনাম ছিলো “ইসলামে আর্থিক সুবিধা পুত্রের চেয়ে কন্যার বেশি” এখন তাঁর সেই লেখাটি হুবহু নিচে তুলে ধরছি। তিনি লিখেছেন “পত্রপত্রিকার খবরে দেখা যাচ্ছে , সদ্য প্রস্তাবিত নারী উন্নয়ন নীতিতে সরকার উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষকে সমান করতে চাচ্ছে। তা করা হলে কুরআনের সূরা নিসার আয়াত নম্বর ১১-এর নির্দেশিত বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন করা হবে। অথচ এটি একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে পুত্রের চেয়ে কন্যার আর্থিক অধিকার এবং সুবিধা বেশি। নিম্নের বিশ্লেষনই তা প্রমাণ করবে।
আমার নিজের কথাই বলি। আমরা অনেক ভাই-বোন ছিলাম। আমার মরহুম আব্বার সমগ্র সম্পত্তির মূল্য আজকের বাজার দরে প্রায় ৯০ লাখ টাকা হবে। আমরা প্রত্যেক ভাই ১৫ লাখ টাকার উত্তরাধিকারী হয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বোন সাড়ে সাত লাখ টাকার উত্তরাধিকারী হয়েছিল। অর্থাৎ আমার সুবিধা বোনের তুলনায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেশি ছিল। অন্য দিকে ইসলামী বিধান মোতাবেক (কুরআনের সূরা বাকারা, সূরা নিসা ও সূরা তালাক) আমাকে আমার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যার ভরণপোষণ ব্যয় বহন করতে হয়েছে। আজকের মূল্যে তা অন্তত ৩০হাজার টাকা মাসিক খরচ হবে। আমার স্ত্রী ৩০বছর বিবাহিত জীবনের পর মারা যান। এ সময় আমাকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা করে ৩০ বছর ধরে ব্যয় করতে হয়েছিল, যার পরিমাণ (৩০,০০০১২৩০) এক কোটি আট লাখ টাকা। এর পরও পিতা হিসেবে আমার কন্যার জন্য আমাকে অনেক খরচ করতে হয়। অন্য দিকে আমার বোনের কোন অর্থ ব্যয় করতে হয়নি বোনের স্বামী, পুত্র বা কন্যার ভরণপোষনের জন্য। কেননা কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক তারা এর জন্য দায়িত্বশীল নয়। অর্থাৎ ভরণপোষনের ক্ষেত্রে যেখানে আমাকে এক কোটি আট লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে, সেখানে এ পরিমান অর্থ আমার বোনকে ব্যয় করতে হয়নি। এ ক্ষেত্রে বোনের সুবিধা এক কোটি আট লাখ টাকা। যদি আমার সাড়ে সাত লাখ টাকা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অধিক সুবিধা বাদ দেওয়া হয় তাহলে বোনের নিট সুবিধা হয় (১,০৮,০০,০০০-৭,৫০,০০০=১,০০,৫০,০০০/=) এক কোটি পঞ্চাশ হাজার টাকা। এ হিসাবে আমি মোহরানা ধরিনি। অসংখ্য ক্ষেত্রে হিসাব করে দেখেছি, সার্বিক আর্থিক সুবিধা ইসলামী বিধানে পুত্রের চেয়ে কন্যার বেশি।
পিতা-মাতার উত্তরাধিকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমান। ভাই-বোনরা, যে ক্ষেত্রে তারা উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন, বেশ কিছু ক্ষেত্রে সমান পান। এসব ক্ষেত্রেও সব শ্রেণীর পুরুষের আর্থিক দায়িত্ব নারীর চেয়ে একইভাবে বেশি। হিসাব করে দেখেছি, আমেরিকার জনগন যদি ইসলামী আইন অনুসরণ করে, তাহলে নারীরাই অধিক সুবিধা পাবে। সেখানে উত্তরাধিকার খুব সামান্যই পাওয়া যায়। কেননা বেশিরভাগ মানুষ ক্রেডিট কার্ডে চলে, তাদের সঞ্চয় নেই বা থাকলেও তা খুবই সামান্য ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে। সে দেশে মাসিক খরচ যদি মাত্র দুই হাজার ডলারও ধরি তাহলে ৩০বছরের বিবাহিত জীবনে ইসলামী আইন মোতাবেক নারীর সুবিধা হবে (২,০০০১২৩০) ৭,২০,০০০ ডলার (বাংলাদেশী টাকায় ৭,২০,০০০৭০=৫,০৪,০০,০০০/=) পাঁচ কোটি চার লাখ টাকা।
এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আশা করি এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে, পুরুষ ও নারীর আর্থিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ইসলাম মূলত নারীদের অধিক সুবিধা দিয়েছে। তাই উত্তরাধিকার আইন বদলের যে কোন প্রচেষ্টা অপ্রয়োজনীয়। তদুপরি ৯০ ভাগ মুসলিম অধিবাসীর বাংলাদেশে এ ধরনের সরাসরি কুরআন বিরোধী বিধান প্রবর্তন জনগনের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। দেশে উত্তেজনা সৃষ্টি হবে। আমি সরকারকে অনুরোধ করি, যেন তারা এ উদ্যোগ থেকে সরে আসেন। নারীদের সব ধরনের অধিকার দেওয়া হোক, তাদের অধিকার যাতে তারা সত্যিকার অর্থেই পায় এবং কথায় যাতে তা সীমাবদ্ধ না থাকে, তার জন্য ব্যবস্থা নিন। সরাসরি কুরআন ও ধর্মের সাথে সংঘর্ষশীল ব্যবস্থা নেবেন না। এসব বিধান ভাল করে কার্যকরও হয় না। যে সব আইনের পেছনে নৈতিকতার সমর্থন রয়েছে, ধর্মের সমর্থন রয়েছে, সেগুলো বেশি কার্যকর হয়। ধর্ম বিরোধী আইন কখনোই সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয় না। কেননা আইনের পেছনে দরকার নৈতিক ভিত্তি।”
প্রিয় পাঠক/পাঠিকা, উপরের আলোচনা থেকে মনে হয় এটা স্পষ্ট যে, সরকার যে নারী নীতি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন তাতে পুরুষরা নয় বরং নারীরাই ঠকবে বেশি। আশা করি সরকার সকল দিক বিবেচনা করে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবেন।
সর্বশেষ পবিত্র কুরআনের একটা আয়াতের মাধ্যমে আজকের লেখার ইতি টানবো। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, “ (হে নবী!) আপনি বলে দিন, আমার নিজের ভাল-মন্দের মালিকও তো আমি নই, তবে আল্লাহ তায়ালা যা চান তাই হয়। যদি আমি অজানা বিষয় সম্পর্কে জানতাম, তাহলে আমি (নিজের জন্য সে জ্ঞানের জোরে) অনেক ফায়দাই হাসিল করে নিতে পারতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না, আমি তো শুধু (একজন নবী, জাহান্নামের) সতর্ককারী ও (জান্নাতের) সুসংবাদবাহী মাত্র, শুধু সে জাতির জন্যে যারা আমার উপর ঈমান আনে।-সূরা আল আ’রাফ, আয়াত ১৮৮।”

ভুলের ফাঁদে সরকার : সংকট এগিয়ে আসছে- হাসান ফেরদৌস

সমস্যা নেই, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। এটা এখন যেমন সত্য, অতীতেও তেমন ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। সমস্যা নিয়েই যখন বসবাস, সে ক্ষেত্রে সমস্যা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। উদ্বেগের সৃষ্টি হয় তখনই যখন সমস্যা সংকটের আকার ধারণ করে। সমস্যা একটি দেশের মানুষকে ভোগায়, সংকট হঠাৎ করে তাদের জীবনযাপন দুঃসহ করে তোলে। ওলট-পালট করে দেয় দৈনন্দিন জীবনের ছকবাঁধা যাত্রা। সবাই একইভাবে সংকটে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, কোন শ্রেণী বেশি হয়, কোন শ্রেণী কম। সংকট যত বড় ধার দীর্ঘস্থায়ী হয় তার ক্ষতিকর প্রভাবও হয় তীব্র ও মারাত্মক।
সরকার পরিচালনায় ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে সরকার ভুলের ফাঁদে পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এই সেদিন ঢাকার নবাবগঞ্জ-দোহার এলাকায় নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্তটি যে ভুল ছিল তা সরকার মুখে স্বীকার না করলেও অন্তর দিয়ে বুঝতে পেরেছে। অতি উৎসাহী কিছু লোক বা ২/১ জন মন্ত্রী সরকারকে দিয়ে এই সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করিয়ে সরকারকে একপ্রকার হেনস্থা করে ছাড়লেন! সেই জের কাটতে না কাটতেই মন্ত্রিপরিষদে কন্যা সন্তানদের উত্তারাধিকার আইনের যে খসড়াটি অনুমোদন করা হল তাও অত্যন্ত বিতর্কিত। এই মুহূর্তে সরকারের জন্য অনুরূপ একটি আইন পাস করানোর উদ্যোগ কোনক্রমেই ঠিক হয়নি। ৯২ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এদেশের আনাচেকানাচে হাজার হাজার মাদ্রাসা আছে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে লাখ লাখ কর্মীবাহিনী আছে, যারা অত্যন্ত সুশৃংখল। এমতাবস্থায় ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো দেশের মানুষকে আইনটির বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং এ নিয়ে তাদের জন্য আন্দোলন করা সহজ হবে। এছাড়া ওঁৎ পেতে থাকা বিরোধী দলও এসব থেকে সহজেই ফায়দা লুটতে সক্ষম হবে। আর দেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এভাবেই সরকারবিরোধী বড় আন্দোলন গড়ে তোলাও সম্ভব হবে। এমতাবস্থায় দেশের মূল সমস্যার সমাধানে আমলা-মন্ত্রীসহ মহাজোট সরকারের সব রাজনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়োজিত না করে কন্যা সন্তান উত্তারাধিকার আইন পাসসহ ওই ধরনের অন্যান্য কাজে হাত দেয়ার আগে দশবার ভাবতে হবে।
সরকারকে ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’ প্রবাদটি মনে রাখতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যে বলয়টি ঘিরে রেখেছে তাদের মাথা থেকে স্থূল চিন্তাগুলো বাদ দিতে হবে। যখন তখন যা খুশি মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন না করে দেশের মানুষের মূল সমস্যার দিকে সর্বশক্তি নিয়োগ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। শ্রেণীস্বার্থবিষয়ক কোন আইন বা বিল কোন শ্রেণীবিশেষ থেকে উত্থাপনের চেষ্টা করা হলে কোন না কোন মন্ত্রী বা নেতাকে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে হবে। সবসময় কচ্ছপের খোলের মধ্যে মাথা নিয়ে থাকলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, সরকার এমনিতেই বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। তাদের সামনে অনেক কাজ, অথচ সময় কম। তাই এ সময়ে যারা আড়িয়ল বিল ভরাট করে বিমানবন্দর বানানোর বুদ্ধি দিয়েছিলেন বা কন্যা সন্তান উত্তরাধিকার আইন পাসের বুদ্ধি দিচ্ছেন, হয় তারা ভুল করেছেন, না হয় চাটুকারিতা করছেন। দেশের মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে জর্জরিত; বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির জন্য দেশে যখন হাহাকার এবং সরকারের হাতে যখন ছোট-বড় প্রচুর প্রকল্প, তখন অহেতুক নিত্যনতুন কিছু সমস্যা উদ্ভাবন করা হচ্ছে কেন তা বোঝা মুশকিল হয়ে পড়েছে।
পদ্মা সেতুর মতো বিরাট-বিশাল প্রকল্প যা বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে শেষ করার কথা, ঢাকার যানজট নিরসনে কুড়িল-বাড্ডা-গুলিস্তান ফ্লাইওভারসহ যেসব প্রকল্প রয়েছে সেসব বাস্তবায়ন করা; গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সমস্যা নিরসনে যেসব প্রকল্প রয়েছে তা বাস্তবায়ন করাসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। ১৬/১৭ কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষার চাহিদা পূরণের জন্য সরকারের মন্ত্রিপরিষদ, সংসদ সদস্যসহ মহাজোট সরকারের প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মীকে যখন দিনরাত পরিশ্রম করে সেগুলোকে বাস্তবায়নে কাজ করা দরকার, তখন সরকার কেন নিত্যনতুন সমস্যায় জড়াতে চাচ্ছে সেকথাও আমরা বুঝতে পারছি না। সরকার কাদের বুদ্ধিতে চলছে সেকথাও প্রাসঙ্গিকভাবেই এসে যাচ্ছে। নাকি সরকারের মধ্যেই আরেক সরকার আছে, যারা এসব বিষয়ে কলকাঠি নাড়ছেন! সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, যখন আড়িয়ল বিল ভরাট করে বিমানবন্দর নির্মাণের কথা উঠল, সেই মুহূর্তে কোন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য বা এমপি বা কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ‘এই মুহূর্তে তার যথার্থতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন না। মন্ত্রিপরিষদে যখন কন্যা সন্তান আইনের প্রশ্ন উত্থাপিত হল তখনও কেউ তার প্রতিবাদ করলেন না। এভাবে সবাই সর্বক্ষেত্রে ‘জি হুুজুর’ মার্কা হয়ে পড়লে ক্রমশ ভুলের সংখ্যাই বাড়তে থাকবে। আর বারবার ভুল করার নামই হবে ‘ভুলের ফাঁদে আটকে যাওয়া’।
সামাজিক, রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে শেষেরটাই মারাত্মক। অর্থনৈতিক সংকট সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের সূচনা করে তা ঘনীভূত করতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটের উৎস দেশের ভেতরেই দেখা যায় সাধারণত। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে উন্নত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হলে তার দ্বারা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সব দেশই। ২০০৭ সালে আমেরিকায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে সংকট দেখা দেয় তা ছড়িয়ে পড়ে সব উন্নত দেশে, উন্নয়নশীল দেশগুলোও রেহাই পায়নি, যদিও এ কারণে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশ আমেরিকা-ইউরোপের ফাইনান্সিয়াল মেল্টডাউন থেকে রক্ষা পেয়েছিল বিশ্বায়নে তার সীমিত ভূমিকার জন্য। এছাড়া সরকার সঙ্গে সঙ্গে সংকটের মোকাবেলায় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল সেসব ছিল সময়োপযোগী ও কার্যকর। মন্ত্রণালয় বেশ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিল এবং কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে হয়নি। তাদেরকে সরকারি খাত থেকে টিকে থাকার জন্য সাহায্যও পেতে হয়নি। পোশাকশিল্পের রফতানি কমে যাবে বলে যে আশংকা ছিল, তাও জল্পনা-কল্পনার ভেতরই ছিল সীমাবদ্ধ।
কিন্তু অদূরভবিষ্যতে, কিছুদিনের ভেতরই সুনামির মতো একটা আর্থিক সংকট এসে আঘাত করতে পারে বাংলাদেশকে। এটা কেবল অনুমান না, বেশ বাস্তব বলেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। এবারে সংকটের যে ঝড় শুরু হয়েছে তার চোখের ভেতর অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতোই বাংলাদেশ বলা যায় অন্যান্য দেশের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে একটু বেশিই। এ সংকট শুরু হবে অর্থনৈতিক হিসেবে, প্রভাব ফেলবে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। এটা হবে এমন সংকট, যা এর আগে বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে হয়নি। এ বাস্তবতা মনে রেখে সচেতন হয়ে জরুরি ভিত্তিতে এখনই নিতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। দেরি করা হলে বা রুটিন অনুযায়ী দেখা হলে এ অর্থনৈতিক সংকট সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করবে প্রায় অবশ্যম্ভাবীভাবে। প্রায় একই সঙ্গে বহির্বিশ্বে দুটি ঘটনা ঘটেছে, যা থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের সূত্রপাত হবে। প্রথমটি মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও যুদ্ধবিগ্রহ। মিসর, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন ও লিবিয়ায় বড় ধরনের সহিংসতা দেখা দিয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগে। মিসর আর তিউনিসিয়া আপাতত শান্ত কিন্তু ইয়েমেন ও বাহরাইনে রক্তপাত আর সহিংসতা বন্ধ হয়নি। লিবিয়া আন্তর্জাতিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরব, ওমান ও জর্দানে ছোটখাটো আন্দোলন হয়েছে, তবে সেসব দেশে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে না তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে এ জন্য যে, সেখানকার অনেক দেশে হাজার হাজার বাংলাদেশী নাগরিক কাজ করছে। এদের অধিকাংশই দরিদ্র অথবা নিন্মবিত্ত। বিদেশে চাকরি পাওয়ার জন্য এসব বেকার, অর্ধবেকার পরিবারের জমিজমা বিক্রি করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় প্রবাসী হয়েছে। হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে তারা দেশে যে অর্থ পাঠায়, তাই দিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্ন জোটে, কোন কোন পরিবারের ভাগ্যও খুলে যায়। প্রবাসী শ্রমিক-চাকরিজীবীদের পাঠানো অর্থের বদৌলতেই বাংলাদেশ তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত কয়েক বছর ধরে দশ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার রাখতে পেরেছে। এ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে গোলযোগ ও যুদ্ধবিগ্রহ শুরু হয়েছে, তার মধ্যে লিবিয়াতে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করছিল। এদের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের উপরে হবে। প্রাণরক্ষার জন্য সবকিছু ফেলে তারা মরুভূমি দিয়ে হেঁটে তিউনিসিয়া সীমান্ত অতিক্রম করে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছে দেশে ফিরে আসার জন্য। এদের অভিযোগ, লিবিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস তাদের জন্য কিছু করেনি। অন্যসব দেশ তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও বাংলাদেশ সরকার ছিল বেশ পিছিয়ে। আটকেপড়া এবং মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া শ্রমিকরা বেশিরভাগই এসেছে আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্যে। অবশ্য সরকার থেকে এ সংস্থাকে সাহায্য করতে অনুরোধ করা হয়েছে। ফিরে আসার পর এসব শ্রমিক সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্য চাইবে, বিকল্প চাকরির ব্যবস্থা করা হোক বলে দাবি করবে। তাদের জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সাহায্য বা অন্য ধরনের সাহায্য দেয়া না হলে এরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রায় অনশনে দিন কাটাতে বাধ্য হবে। ফলে এদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হবে এবং এদের জন্য সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। এদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য কোন রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন হবে না। এরা নিজেরাই এগিয়ে আসবে, কেননা এরা ভুক্তভোগী এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেখে এসেছে জনসাধারণ বিক্ষুব্ধ হলে কী করতে পারে। এদের শান্ত করার জন্য, ক্ষোভ প্রশমনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে যে সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে, তা হবে দেশের জন্য ক্ষতিকর। স্বল্পমেয়াদি জরুরি সাহায্যের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার কথা চিন্তা করতে হবে। এর জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করে পরিকল্পিতভাবে কর্মসূচি হাতে নেয়া প্রয়োজন। এটা করতে হবে এখনই, ঠিক যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর করা হয়ে থাকে। একে জরুরি পরিস্থিতি বলে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশী শ্রমিকদের হঠাৎ দেশে ফিরে আসা এবং জাপানে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ স্থাপনায় দুর্ঘটনার ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরবরাহ বেশ কমে যাবে, যা আর্থিক সংকটের রূপ নিতে পারে। এর মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে আমদানি খাতে ব্যয় হ্রাস করতে হবে। খুব প্রয়োজনীয় ছাড়া পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে অনেক ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়, যা জীবনধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নয়। এসব আমদানি বন্ধ করা হলে জীবনযাপন বিপন্ন হবে না। ধনী ও বিত্তবান শ্রেণীর স্বার্থ না দেখে সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। তাদের জীবনযাপনে যা প্রয়োজনীয়, সেসব ছাড়া অন্যান্য পণ্য আমদানি এখনই বন্ধ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রফতানি বাড়ানোর জন্যও পদক্ষেপ নেয়ার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে আসায় অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হবে, তার নিরসনে বিকল্প সব সম্ভাব্য সূত্র থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের/আয়ের কথা ভাবতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও কর্মসূচি তৈরি। এখানেও অর্থ মন্ত্রণালয়কেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। সব সংকটেই সময় থাকতে ব্যবস্থা নেয়া হলে সংকটের তীব্রতা হ্রাস পায়। যত দেরি হয়, সংকট ততই তীব্র হয়। অবহেলা বা রুটিনমাফিক কাজ করার জন্য যেন এমন পরিণতি দেখা না দেয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সংকট ও দুর্যোগ মোকাবেলায় যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে সংকট এগিয়ে আসছে, তার মোকাবেলা করা যাবে এমন আশা করা যায়। কিন্তু সময়মতো সবকিছু করার প্রয়োজন রয়েছে। কেননা টাইম ইজ দি এসেন্স। সব    সংকটে সময়ের সদ্ব্যবহারই সমাধান নিয়ে আসে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই।

কেয়ামতের খুচরা এ্যাকশন শুরু -জহুরী

কেয়ামতের আর বেশী বাকি নেই। খুচরা এ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। চুড়ান্ত অবস্থা কবে এবং কখন শুরু হবে তা আল্লাহ ভাল জানেন। তবে আলামত যা দেখা যাচ্ছে  তাতে মনটা যেন বলছে, আর বেশী দেরী নেই, মানুষের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা, মন-মানস তথা চারিত্রিক পরিবর্তন যেভাবে দ্রুত ঘটছে, সেই পরিবর্তিত চরিত্রের সঙ্গে কেয়ামতের আলামতগুলো বীজগণিতের ফর্মূলার মত মিলে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক জগতে যে ওলট পালট  অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছে তাও রোজ-কেয়ামতের সঠিক পূর্বাভাস বলে গণ্য করা যায়।
সুতরাং যে যেখানে যে অবস্থ—ায় যে কাজ নিয়ে আছেন, তিনি নর না নারী , বাদশাহ না ফকির, শাসক না শাসিত, সাদা না কালো, ধনী না গরীব, শক্তিমান না দূৃর্বল, শিক্ষিত না অশিক্ষিত অর্থ্যাৎ জাগতিক পরিচিতি যাই থাক না কেন সকলেরই হুশিয়ার হওয়ার সময় এসে গেছে। লাফালাফি-দাপাদাপি বন্ধ করুন। লাফ দিয়ে এই সীমাহীন শূন্যতার কতটুকু উচ্চে উঠতে পারবেন? দেহের সকল শক্তি দিয়ে লাথি মেরে কতটুকু জমিনের কত ইঞ্চি  দাবিয়ে দিতে পারবেন শুনি? লাফালাফি-দাপাদাপি যে যতই করুন না কেন, কোন মর্দের বাহাদুরী কতটুকু তা বহুবার  দেখা গেছে। কোটি কোটি মানুষের শান্ত  কলিজায় যিনি  কম্পন সৃষ্টি করতে পারেন, সেই ব্যক্তিকেও দেখা গেছে যে , সামান্য একটা ধাক্কায় চিরদিনের জন্য চিৎ হয়ে পড়ে থাকতে। অতএব বাহাদুরী করার আগে যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ দেহটাকে দেখে নিতে  পারেন তাহলে দম্ভ-ভরা বুকটা অস্বাভাবিকভাবে কখনো ফুলে উঠবে না।
অবস্থা কেনম কেমন যেন ঠেকছে। সময় থাকতে অট্রহাসিকে মুচকি হাসিতে সীমিত করে ফেলুন ,একটানা  কান্নার সময় আসার আগেই হি-হি হে-হে করার অভ্যাস ত্যাগের অভ্যাস করুন। মানব চরিত্রে কেয়ামতের আলামত শুরু হয়ে গেছে এসম্পর্কে হাদিস শরীফে ছোট ছোট আলামত  গুলো এভাবে বর্ননা করা হয়েছে। লোকেরা ওয়াকফ সম্পত্তিকে নিজের সম্পত্তির মত মনে করে ভোগ  করবে। জাকাত দেয়াকে দন্ডস্বরূপ মনে করবে । আমানতের মালকে নিজের মালের মত মনে করে হস্তক্ষেপ করব্ েপুরুষরা স্ত্রীর তাবেদারী করবে। মা-বাপকে পর মনে করতে থাকবে এবং পরকে আপন ভাবতে থাকবে। দ্বীনের ইলিম দুনিয়ার অর্থ উপার্জনের জন্য শিক্ষা করবে। চরিত্রহীনরাই দেশ শাসনে আসবে। অযোগ্যরা বড় বড় দায়িত্ব পালনের জন্য বড় বড় পদ দখল করে নেবে । জুলুমের ভয়ে জালিমকে তাজীম করবে । নাচ-গানের প্রসার ঘটবে, বেহায়ামীপনা ও জ্বেনাকারী বৃদ্ধি পাবে। বাদ্য বাজনার প্রচলন খুব বেশি হবে । নেক লোকদের আহাম্মক , বোকা, পশ্চাদপদ বলে পাপীরা অখ্যায়িত করবে । এ সব আলামত যখন পাওয়া যাবে তখন মনে করতে হবে যে, কেয়ামত নিকটবর্তী। এ অবস্থা  সৃষ্টি হলে তখন আগুনে বাতাস প্রবাহিত হবে। পৃথিবীর গর্ভে লোক হারিয়ে যাবে। আকাশ থেকে প্রস্তর বর্ষিত হবে। কিছু লোকের আকৃতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। দ্বীনের এলম চর্চা হ্রাস পাবে। মিথ্যা  বলাকে বুদ্ধিমত্তা বলে মনে করা হবে। মিথ্যা ও অন্যায় আইন-কানুন জারি হবে।
এবার চিন্তা করে দেখুন , আলামত শুরু হয়ে গেছে কিনা। ওয়াকফ সম্পত্তি ক্রমশ: হাত ছাড়া হচ্ছে।  দেশের বিভিন্ন  জাযগায ওয়াকফ  সম্পত্তি নিয়ে রীতিমত কাড়াকাড়ি  শুরু হয়ে গেছে । আপনি যে জেলার বাসিন্দা হোন না কেন, একটুখানি খোঁজ খবর নিলে এমন বেহাত ওয়াকফ সম্পত্তির সন্ধান অবশ্যই পাবেন। জাকাত দেয়াকে অনেকেই নিজেদের উপর জুলুম মনে করেন। অনেকে জাকাতই দেনা না। আবার অনেকে জাকাত দেন তবে কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে অর্থ্যাৎ প্রচার প্রপাগান্ডা করে। জাকাত দেয়া যাদের উপর ফরজ তাদের শতকরা পাচঁভাগ সঠিকভাবে এবাদত জ্ঞান   করে জাকাত আদায় করেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। আমানত খেয়ানত করা তো এখন অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। শ্বশুরের টাকা জামাই মেরে নিচ্ছে , জামাইর টাকা শ্বশুরে হজম করে নিচ্ছে, এতিমের আমানত সবলেরা লুটে -পুঠে খাচ্ছে কৃষককে ঋণ দানের আমানত টাকা ব্যাংকের একশ্রেনীর লোকজন ষড়যন্ত্র করে আত্মসাত করছে,, আজ অমুক ব্যাংকের ক্যাশিয়ার কাল তমুক ব্যাংকের ক্যাশিয়ার, পরশু আবার অন্য ব্যাংকের ক্যাশিয়ার মোটা অংকের ক্যাশ নিয়ে উদাও হয়ে যাচ্ছে।
এসব খবর প্রায় প্রতিদিনের কাগজে আমরা পাঠ করছি। স্ত্রৈণ পুরুষের সংখ্যা ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে।  স্ত্রীর বাপের টাকায় অনেক জোয়ান মর্দ গরু-মহিষের মত বিক্রি হয়ে স্ত্রীর পরমাবর্দারে পরিণত হচ্ছে। যৌতুকের  ভারী বোঝা পিঠে নিয়ে বহু পুরুষ স্ত্রীর কাছে আজ্ঞাবহ দাসের মত জীবন-যাপন করছে। শহরে বন্দরে বিলাস-বহুল বিপণী বিতানে স্ত্রী ভ্যানিটি ব্যাগ হাতে নিয়ে আগে আগে হাটেন আর পিছনে পিছনে স্বামী নামক কেনা বান্দা কেমন সুশীল বালকের মত শুধু স্ত্রীকে অনুসরণ করেন। যৌতুকের যত পসার ঘটছে স্ত্রী তাবেদার স্বামীর সংখ্যা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মা-বাপকে পর মনে করার মত সন্তানের সংখ্যা এখন বেশুমার। বিয়ের আগে যেমন তেমন; কিন্তু  যৌতুকের জোয়াল কাধেঁ নিয়ে বিয়ে করার পর প্রায় সন্তাননেরাই আপন বাবা পর হয়ে শ্বশুর বাবা আপন হয়ে যায়। আপন মা পাত্তা না পেলেও শ্বাশুড়ীর মার কদমবুচির বারবার করতে জামাই বাবাজীর মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আজকাল অনেক মা বাবার লায়েক সন্তানকে দেখা যাচ্ছে যে, বাপের বাড়ী ত্যাগ করে শ্বশুরবাড়ী গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে দিয়েছেন। আপন ভাইকে দূরে ঠেলে দিয়ে বউয়ের ভাইকে সহোদরের জায়গায় বসাতে অনেককে দেখা যাচ্ছে। নিজের ভাই কলেজের মাস মাহিনা দিতে না পারার কারণে লেখা পড়া ত্যাগ করলেও শালা সাহেবের হোস্টেলের চার্জ পরিশোধে কখনো বিলম্ব হয় না। দ্বীনের ইলিম দুনিয়ার  অর্থ উপার্জনে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে। দেশ শাসনে চরিত্রহীনদের প্রতিযোগিতা দেশে দেশে  যে চলছে তা বোধ হয় ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই।
মামা ভাগিনা, চাচা ভাতিজা, আর শালা দুলাভাইর সম্পর্কের সাঁেকা পেরিয়ে স্বজনপ্রীতির মাদুলী গলায় ঝুলিয়ে অথর্বরা বড় বড় পদ দখল করতে সক্ষম হচ্ছে। আজকাল এসব কোন লুকোচুরি ব্যাপার নয়। জুলুমের ভয়ে জালিমের তাজিম করা আজকাল রেওয়াজ হয়ে গেছে। উপায় তো নেই, প্রত্যেকের গর্দানের উপর মাথা তো একটাই। ইনসাফের রশি ঢিলা হয়ে পড়লে জালিমদের দোরাত্মা বাড়ে। উদ্যত পিস্তলের সামনে পণ্ডিতের কলম খুবই অসহায়। নেশাখোরদের সংখ্যাও বেড়ে চলছে। দেশী-বিদেশী মদ, গাজা, ভাঙ থেকে শুরু করে নিচের দিকে বিড়ি সিগারেট সহ নেশাখোরদের অবস্থা যা তাতে অবাক হতে হয়। সংখ্যাটা প্রতি বছরই শুধু বাড়ছে আর বাড়ছে। নাচ-গান, বাদ্য-বাজনার প্রসারও ক্রমশ: ব্যাপ্তির দিকে। এসবকে সংস্কৃতি চর্চা নাম দিয়ে প্রতি গ্রামে প্রতি স্কুলে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। বেহায়ামীপনা তো আধুনিকতার ভূষণে পরিণত হয়েছে, জ্বেনাকারের দল ক্রমশ: ভারী হচ্ছে। পশ্চিমা দুনিয়ায় কুমারী ষোড়শী ডুমুরের ফুল। উন্নয়নশীল দেশেও জোর হাওয়া লাগছে। এখন সামাল সামাল অবস্থা। সর্বশেষ কথা হলো, যারা দ্বীনের পথের পথিক হওয়াকে পছন্দ করেছে তাদেরকে শুধু বোকা বা আহাম্মক বলা হচ্ছে না বরং তারা পশ্চাদপদ, প্রতিক্রিয়াশীল, প্রাগৈতিহাসিক, সেকেলে, মধ্যযুগীয় ইত্যাদি হরদম বলা হচ্ছে। সুতরাং এসব আলামত তো শুরু হয়ে বেশ অগ্রসর হয়ে গেছে। উত্তপ্ত বাতাস প্রবাহিত হয়ে খরায় জ্বলছে স্পেন, অষ্টেলিয়া, ভারত, জাপান, ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া সহ বহু দেশ। ভুমিকম্প হওয়ার কারণে এই দশকে ইরান, ইকুয়েডর, রোমানিয়া ও জাপানসহ অনেক দেশেরই লোকালয় পৃথিবীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। লোকের আকৃতি প্রকৃতির পরিবর্তনও লক্ষনীয়। প্রায়ই শুনা যাচ্ছে এবং খবরের কাগজে সংবাদ বের হচ্ছে যে, অমুক নারী ্এখন পুরুষ হয়ে গেছে আর অমুক পুরুষ নারী হয়ে গেছে। দুই দশক আগেও এমন সংবাদ শুনা যায়নি, কিন্তু আজকাল পরিবর্তিত আকৃতি প্রকৃতির নারী পুরুষ ও দেখা যাচ্ছে। আলামতগুলে  হুবহু মিলে যাওয়ার পরও যাদের মনে কোন ভাবান্তর ঘটবে না, তারা দাজ্জালের শিষ্যত্ব গ্রহনের উপযুক্ত বলে অবশ্যই বিবেচিত হবে। তবে এসব কথায় যদি তাদের বিশ্বাস থাকে।

কবিতা

জীবনটা
জুবায়ের হুসাইন

জীবনটা চলছে তো চলছে
মুখে কথা বলছে তো বলছে
এতটুকু থামবার সময় যে নেই
থামলেই থেমে যাবে জীবনের খেই।

জীবিকার দায়ে কেউ খাটছে
কেউ খালি হাঁটছে তো হাঁটছে
পিছে ফিরে তাকাবার ভ্রƒক্ষেপ নেই
তাকালেই তাক লেগে যাবে পলকেই।

খবরের কাগজে যা মিলছে
পাঠক তা গোগ্রাসে গিলছে
সাদা-কালো নিউজের হিসেব তো নেই
নিউজেই ‘নিউ’ কিছু হয় টেবিলেই।

বনে বনে ফুল-কলি ফুটছে
কেউ কেউ দেদারসে লুটছে
ফিরে কিছু দেখবার সময় যে নেই
দেখলেই দেখা যাবে জীবনটা নেই।


জাগরণ
নূর মোহাম্মদ

রাতের গগনে তারার মেলা
চাঁদেও হাসি পাই,
ঊষার লগনে রবির হাসি
আঁধার দেখি নাই।
জোৎসনা আলোয় জাগে যকন
জোয়ার ভাটার স্রোত
সবুজ রঙগে হাসে তখন
নদীর দুই ঠোট।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের আকাশে দেখো
যতো প্রতিভার মেলা
এসব সঠিক চেতনার ফল
অধ্যবসায়ের মালা।
খোলে দাও দ্বার তোমার
হবেই দেশের উত্তর
খোজে নাও পত প্রতিভার
তবেই তোমার উচ্চাসন

কারাগারের চাবি
হান্না হানান

মানুষের কানে শুনিয়েছে যারা মুক্তির জয়গান
তারাই আজি লৌহ কারায় দিন করে গুজরান।
কোরআন হাদীস ফেকাহ নিয়ে যাদের জীবন চলা
তাদের হাতে হাতকড়া আজ বুকে লোহার তালা।

যাদের মুখে জাগ্রত সদাআল কোরআনের গান
বদ্ধ কারায় থাকছে আজি তাদের বন্দী প্রাণ।
অত্যাচারের প্রতিবাদে করত যারা মিছিল
পাষান কারায় বন্দী তারা বাইরে লোহার খিল।

জালিম শাসক রক্ত চুষে মারছে জনগন
অমানিশার আঁধার এসে ডাকছে সবার মন।
ধর্মভীরু লোকের বুকে চৈত্র সম খড়া
কি হয়েছে বাংলাদেশে স্তব্ধ বসুনধরা।

পূব আকাশে আগের মত সূর্য উঠে জানি
তবুও রোজ আকাশ হতে ঝড়ছে যে তার পানি।
মজলুমানের কান্না শুনে নীল সাগরের ঢেউ
আছড়ে পড়ে তীরের কোলে খোজ কি রাখে কেউ ?

বন্দী মোদের প্রিয় নেতা সত্যি কথা নয়
আমরা সবাই বন্দী যেন হ“দয় কেঁদে কয়।
দোযখ হতে ঝড়না হয়ে নীল বেদনার পানি
আর্তনাদে কাদছে মরে করছে কানা কানি।

চাইনা মোরা বাংলাদেশে অমানিশার আঁধার
পূবাল হাওয়ায় ভাসুক না আর করুন হা হা কার।
মুক্তিকামী সব মানুষের একটি প্রাণের দাবী
মোদের হাতে দাওনা তুলে কারাগারের চাবি।

প্রিয় নেতার মুক্তি যে চাই নইলে আন্দোলন
ভন্ড নারীর ভ্রান্ত আশার হবে গো পতন।
আমরা সবাই উঠব জেগে জাগবে জনগন
ভন্ড নারীর ভন্ড নেতার ফুরাবে স্বপন।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কবলে মুসলিম বিশ্ব ইহুদি-খ্রিস্টান চক্রের সুদুরপ্রসারী ষড়যন্ত্র মুহাম্মদ নুরউদ্দিন কাওছার

১৮৯৫ সালের শেষ দিকে নিউইয়র্ক থেকে দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হতো। একটি সানডে ওয়ার্ল্ড অপরটি সানডে জার্নাল। কে কত বেশি লোককে হাসাতে বা কাঁদাতে পারে, কে কত আশ্চর্য খবর জানাতে পারে, কে কত অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য ফিচার ও গল্প ছাপতে পারে, সে প্রতিযোগিতায় কর্মকর্তারা সর্বদা ব্যস্ত থাকেন। চমক লাগানোর জন্য শুরু হয় মিথ্যার আশ্রয় নেয়া। শুরু হয় ইয়োলো জার্নালিজমের যাত্রা। তথ্য পরিবেশনের চেয়ে উদ্দেশ্য ও অভিসন্ধি চরিতার্থ করাই এর মূল লক্ষ্য। কাগজের অতিরিক্ত কাটতির জন্য যৌনতা, হিংসা, জিঘাংসা, কেলেংকারী, অপরাধ, মিথ্যাচার, অপবাদ ইত্যাদি বিষয়ক সংবাদ সৃষ্টি করে পরিবেশন শুরু হয়। এটি তাদের দৈনন্দিন কাজে পরিণত হয়। তারা এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন করল যার ভাষা শুনে শয়তানও শরম পায়। অবশেষে ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেল নগরীতে অনুষ্ঠিত হয় ইহুদী সাংবাদিকদের মহাসম্মেল। ৩০০ ইহুদী বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ ও দার্শনিক হার্টজালের নেতৃত্বে সেখানে সমবেত হয়। তৎকালীন বিশ্বের ৩০টি ইহুদী সংগঠনের সবচেয়ে বেশি মেধাবী ৩০০ জন এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এই সম্মেলনে বিশ্বের ওপর ইহুদীদের প্রভাব বিস্তারের জন্য ১৯টি প্রটোকল গ্রহণ করা হয়। তম্মধ্যে দ্বাদশতম খসড়াটি ছিল বিশ্বের সংবাদ পত্রকে কিভাবে ইহুদী কব্জায় আনা যায় এর বিস্তারিত বর্ণনা ও পথ নির্দেশনা বিশেষ।  দ্বাদশতম খসড়ার উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, ‘এমনকি প্রয়োজনবোধে আমরা (ইহুদীরা) এ ধরনের পত্র পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতাও করবো, যেগুলো বিচ্ছিন্নতা, পথভ্রষ্টতা, নেতিকতা ও চারিত্রিক অবক্ষয়, স্বৈরাচারী সরকার ও একনায়কদেরও সমর্থন করবে। আমরা যখন ও যেখানে ইচ্ছা জাতির অনুভূতিকে উত্তেজিত করে তুলবো। আমরা ইহুদীরা এমন ধরনের পরিবেশক, সম্পাদক, প্রতিবেদক ও কলামিস্টদের উৎসাহিত করতে থাকবো, যারা হবে সর্বাধিক লম্পট ও অসচ্ছরিত্র এবং যাদের অপরাধের রেকর্ড থাকবে’। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে ইহুদী ও খ্রীস্টান একই লক্ষ্যে মৈত্রী বন্ধন গড়ে তোলে। মুসলমানরা যাতে সাংস্কতিক দিক থেকে মোটেও অগ্রসর হতে না পারে এজন্য তারা তাদের দ্বাদশতম প্রটোকল অনুযায়ী  শুরু করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, যার নগ্ন বহি:প্রকাশ হলো বিশ্ব ভালবাসা দিবস। এর মাধ্যমে তারা যুব সমাজকে বিপদগামী করার জন্য আয়োজন করছে বিভিন্ন চাকচিক্যময়, নোংরা অনুষ্ঠানের । একটু গোড়ার দিকে ফিরলে আমরা দেখতে পাই ৯০ এর দশকে এদেশে “বিশ্ব ভালবাসা দিবস” হিসেবে আসন গেড়ে বসে এ নব্য সংস্কৃতি। আমাদের দেশে প্রথম “যায়যায় দিন” পত্রিকায় ৯৩ সালে “ভালবাসা দিবস” সংখ্যা প্রকাশ করে। সেই থেকে এ দেশের সকল মিডিয়ায় এটি একটি বিশেষ স্থান দখল করে নেয়। এদিনে তরুন-তরুনী ও প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরকে শুভেচ্ছা কার্ড ও উপহার সামগ্রী পাঠায়। একে অপককে ভালবাসার কথা জানায়। শুধু প্রেমিক প্রেমিকারাই নয় ভ্যালেন্টাইন ডে তে সবাই অর্থাৎ মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান, শিক্ষক, সহকর্মীরা ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটান নানা ভাবে। চরিত্র হননের হাতিয়ার ও নীতি নৈতিকতার স্থলনজনিত কারণসহ আনুষ্ঠানিক মারাত্মক কিছু সমস্যা কারণে ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার ভ্যালেন্টাইনসডে পালনকে নিষিদ্ধি ঘোষাণা করেন। পরবর্তীতে ইতালী, অষ্ট্রিয়া, হাঙ্গেরী ও জার্মানী ফ্রান্সের পথে হাঁটে । এর আগে ১৭ শতকে রক্ষণশীল খ্রীষ্টানদের আধিপত্যের কারণে ইংল্যান্ডে ও এসব উৎসব পালন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৭৯০ সালে রাজা কার্লোস দ্বিতীয় এটা আবার পুনরুজ্জীবিত করেন।
মহান আলাহ এ ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেছেন, “হে নবী আপনি মুমিন যুবকদেরকে বলেন তোমরা তোমদের চক্ষুযুগল অবনমিত কর (আর যুবতীদের দিকে তাকানো থেকে বিরত হও) এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত কর। হে নবী আপনি মুমিন (যুবতীদেরকে) বলেন তারা ও যেন তাদের দৃষ্টিকে নত করে অপর কোন পুরুষের দিকে চোখ না দেয় এবং তাদের সম্ভ্রমকে রক্ষা করে”। কোরআনের এসব আয়েতের মাধ্যমে বুঝা যায় ব্যভিচার করাতো দূরের কথা তার কাছেও যাওয়া যাবে না। ভালবাসা দিবস যেনা নয় কিন্তু এটি যেনাকে উৎসাহিত করে এক সময় ব্যভিচারে লিপ্ত করে। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ও চলছে চরম দেওলিয়াত্ব। চলছে সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির চর্চা। অপসংস্কৃতির বিভীষিকা থেকে মুসলিম সংখ্যাঘরিষ্ঠ দেশ ও বিশ্ব মানবতাকে রক্ষা ও বিরত বাখতে না পারলে হযরত লুত (আঃ) এর কাওমের মত এমনকি তার চেয়েও ভীষণ কোন খোদায়ী গজব নাযিল হয়ে সমগ্র বিশ্ববাসীকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিতে পারেন। তাই এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে সকল পর্যায় থেকে। যার সমাধান ১৪০০ বছর আগে পবিত্র কোরআন এভাবে দিয়েছেন যখন অওউঝ এর কোন ধারণা বিশ্ব সভ্যতা জানতনা “ব্যভিচারিনী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশো কষাঘাত মারবে। আল্লাহর বিধান কার্যকারী করণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের অভিভূত* না করে,  বিশ্ববাসীদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (আন-নূর-২) 
তথাকথিত সভ্যতার দাবীদার পশ্চিমা দেশগুলো নারীকে ঘর থেকে বাইরে টেনে এনে সেক্স ইন্ডাস্ট্রির কাঁচামাল বানানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নগ্নতা, অশীলতা ও বেহায়াপনার প্রতিযোগিতায লিপ্ত হয়েছে। তাই থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন ইত্যাদি দেশের পর্যটন শিল্পগুলো সবই নারী কেন্দ্রিক হয়ে গড়ে উঠেছে। আবুল হাশেম তার ‘ঈৎববফ ড়ভ ওংষধস’ গ্রন্থের ২৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-‘রাশিয়া পিতা ও কন্যা, মাতা ও পুত্র এবং ভ্রাতা ও ভগ্নীর যৌন মিলনের ফলাফল পরীক্ষা করে দেখেছে। স্থানীয় বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা এতে শারীরিক ক্ষয়ক্ষতির তেমন কিছু দেখতে পাননি। কাজেই সে দেশের সরকার এরূপ মিলনকে এদিক থেকে অন্যায় ও দোষণীয় মনে  করেন না। তবে যারা বিবাহ প্রথাকে পছন্দ করেন তাদের নিরুৎসাহিত করতেও ইচ্ছুক নন। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে মানব সমাজ আবার ধীরে ধীরে আদিম বর্বর সমাজের দিকে ফিরে যাচ্ছে। ধর্ম বা সামাজিক বিধি-নিষেধ এখানে প্রতিবন্ধক নয়। যার যেমন খুশি সে চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় অবাধে লিভটুগেদার করবে। সমকামিতার এ কাজ অতিশয় কদর্য, বীভৎস ও বদ-অভ্যাস  আর আল্লাহর দৃষ্টিতে মারাত্মক গুনাহের কাজ। এর ফলে মানুষের জীবনীশক্তি ও প্রজনন ক্ষমতা চিরতরে নি:শেষ হয়ে যায়। যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেছেন এসব কাজে তা বিনষ্ট ও ব্যর্থ হয়ে যায়। এর ফলে মানুষ মনুষ্যত্ব হারিয়ে পশুতে পরিণত হয়ে যায়। ঠিক এ কারণেই ইসলাম যৌন স্পৃহা পূরণের এসব অন্ধকারাচ্ছন্ন গলি ও বাঁকা চোরা পথ অবলম্বন চিরতরে হারাম করে দিয়েছে।  সমকামিতা সম্পর্কে কুরআনে কঠোর হুঁশিয়ারী ও সতর্ক বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। লুত (আ.) এর পুরুষদেরকে এভাবে জিজ্ঞসা করা হয়েছে তাদের এ বদ-অভ্যাস সম্পর্কে- ‘তোমরা পুরুষেরা  দুনিয়ার পুরুষদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছ, আর ত্যাগ করছ তোমাদের জন্য সৃষ্ট তোমাদের স্ত্রীদের? তোমরা হচ্ছ সীমালঙ্ঘনকারী লোক’ (সূরা শুয়ারা-১২৫-১২৬) । হাদীস শরীফে এ অপরাধের দন্ড হিসেবে বলা হয়েছে- ‘ যে দুজনকে তোমরা লেওয়াতাতের (সমমৈথুন) কাজ করতে দেখতে পাবে, তাদেরকেই তোমরা হত্যা করবে’(তিরমিযী)।
তাই ইসলাম ভালবাসাকে শুধু একজন নারী ও পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং ভালবাসার সীমানাকে অনেক বেশি প্রসারিত করেছে। আল্লাহর প্রতি ভালবাসা, রাসূল (সাঃ) ও সাহাবীদের প্রতি ভালবাসা, ভাল ও নেক লোকদের প্রতি ভালবাসা ও আখিরাতের প্রতি ভালবাসা, পিতা-মাতা, সন্তান, ভাই-বোন ও স্ত্রী-পরিজনের প্রতি ভালবাসা, অসহায় মানুষের প্রতি ভালবাসা ইত্যাদি। পরস্পরের প্রতি ভালবাসা ও সম্প্রীতির ব্যাপারে ইসলাম যতটা তাগিদ দিয়েছে ততটা পৃথিবীর আর কোন ধর্মে পাওয়া যাবে না। ইসলামে ভালবাসা প্রকাশের কোন নির্দিষ্ট দিন ও ক্ষণ নেই। সব সময় অন্যের প্রতি সহানুভূতি ও ভালবাসা প্রকাশকে উৎসাহিত করেছে ইসলাম। মহানবী (সাঃ) বলেছেন: ‘‘তোমাদের কেউ যখন তার ভাইকে ভালবাসবে তার উচিত এ ভালবাসার কথা তাকে জানানো” (আবু দাউদ, তিরমিযি)। মহানবী (সাঃ) আরো বলেছেন, “যার হাতে আমার জীবন সে মহান সত্তার শপথ করে বলছি, তোমরা বিশ্বাস স্থাপন না করা পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করতে সক্ষম হবে না যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরের প্রতি ভালবাসা পোষণ কর। আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের কথা বলব যেটি করলে তোমাদের পরস্পরের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি হবে? তোমরা পরস্পরকে সালাম দেয়ার প্রচলন কর” (মুসলিম)। এ হাদিসে ভালবাসাকে জান্নাতে প্রবেশের পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ইসলাম প্রাণহীন জড় বস্তুর প্রতিও ভালবাসা পোষণের কথা বলে। তাই তো মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “এটা ওহুদ পাহাড়। এ পাহাড়কে আমরা ভালবাসি আর এ পাহাড়ও আমাদেরকে ভালবাসে।” ইসলাম দিবস নির্ভর ভালবাসার অনুমোদন দেয়নি। তবে ভালবাসার অনেক উপায় আছে যেগুলো ইসলামী সংস্কৃতিরই অংশ। কারণ দিন ক্ষণ ঠিক করে ভালবাসা যায় না, এরূপ ভালবাসা কৃত্রিম। আল্লাহ বলেন-‘যারা ঈমান এনেছে তাদের সর্বোচ্চ ভালবাসা আল্লাহর জন্য’ (সূরা বাকারাহ-১৬৫)। রাসূল (স.) বলেছেন-‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমার সুমহান ইজ্জতের খাতিরে যারা পরস্পরে ভালবাসা স্থাপন করেছে তারা কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার বিশেষ ছায়ায় স্থান দিব। আজ এমন দিন, আমার ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া নেই’ (মুসলিম)।

অফিসার,
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড,
শরী’আহ্ সেক্রেটারিয়েট, হেড অফিস,

নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও আকাশ-সংস্কৃতির প্রভাব -সালেহ উদ্দিন জহুরী

আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও আকাশ-সংস্কৃতি কি ঘটাচ্ছে? শিরোনামের দিকে নজর দিলে তাই মনে হয় ।
নৈতিকতাভিত্তিক যে চরিত্র গঠনের আবেদন আমরা জানাই, যে আন্দোলন করি, যে অনুশীলন আমরা সাধ্যমত করছি, এই চরিত্রের সঙ্গে আকাশ সংস্কৃতি কি সাংঘর্ষিক, না সহযোগী, আগে এ প্রশ্নের একটা উত্তর আমাদের জানা দরকার।
প্রধানত তিন ধরনের চরিত্র হয়ে থাকে প্রথম শ্রেণীর চরিত্র ভাঙতে পারে কোন ঝড়ো হাওয়ায় বা দুর্ঘটনায়, কিন্তু কখন্হোনংঢ়; মচকাবে না, নত হবে না। আঘাতে আঘাতে তাদের জীবন গর্জে উঠে প্রতিনিয়ত কখনো কখনো হতাশাও আসে কিন্তু কোন সময় ম্রিয়মান হয় না। দ্বিতীয় শ্রেণীর চরিত্র হাফটাইট হাফ ঢিলা, এ চরিত্রকে মুনাফিক চরিত্র বলা যায়। তাদের চরিত্রের কাঁটা এদিকেও আছে ওদিকেও আছে যেদিকে হাওয়া সেদিকে তারা রূপকথার মৎস্যকন্যা (গধৎসধরফ) বলতে পারেন, মাছ ও নারীর ভাগাভাগি দেহ।
তিন নম্বরের চরিত্র প্রথম চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথম চরিত্রের এ মানুষ যাকে অনৈতিকতা বলে, ওরা তাকেই নৈতিকতা বলে যা প্রথম শ্রেণীর কাছে অপসংস্কৃতি ওটাকেই নৈতিকতা বলে, যা প্রথম শ্রেণীর কাছে অপসংস্কৃতি ওটাই ওদের কাছে সংস্কৃতি।্হনংঢ়; আকাশ-সংস্কৃতির সাথে শেষোক্ত দলের সখ্যতা, মিল মহব্বত অত্যন্ত প্রগাঢ়।
সুতরাং বলা যায় আকাশ সংস্কৃতি প্রথম শ্রেণীর চরিত্রবানের জন্য সর্বক্ষণের ঘর্ষণ পাথর কিন্তু তৃতীয় শ্রেণীর চরিত্রের জন্য সর্বক্ষণের উদ্দীপনা বিশেষ। তাদের ক্ষয় হওয়ার মত কিছু নেই আকাশ-সংস্কৃতি যা তাদের দেয় তারা মনে করে ‘বিনোদন’। এই তিন শ্রেণীর চরিত্রকে সামনে রেখে আকাশ- সংস্কৃতির আলোচনা করা যায়।
আকাশ সংস্কৃতি কি? আকাশের তো কোন সংস্কৃতি পয়দা হয় না। তবে হ্যাঁ আকাশ পথে সব সংস্কৃতির বেসাতি চলে, আমদানি-রপ্তানি হয় ক্রয়-বিক্রয় হয় তাই টোটাল সওদাকে আমরা বলতে পারি আকশ- সংস্কৃতি। আপনি আমি এটাকে সংস্কৃতি বলি আর নাই বলি, বাজারে এটাই সংস্কৃতি নামে পরিচিত। আকাশ থেকে এ পর্যন্ত একটি তারকাও খসে পড়েনি, তবুও সিনেমা জগতে, ফুটবল জগতে, ক্রিকেট জগতে অর্থাৎ খেলার জগতে এমনকি পরীক্ষার ফলাফল সীটে হাজার হাজার তারকার ভীড়। এসবের কোন কোনটির পিছনেও আকাশ-সংস্কৃতির ভূমিকা রয়েছে। আজকাল তো অনেক স্টার বা তারকা হিসেবে শুধু থাকতে চান না, মেগাস্টার হওয়ার কসরৎ করে যাচ্ছেন, কেউ কেউ হয়েও গেছেন ইতোমধ্যে।
আকাশ-সংস্কৃতির কারবারটা জানতে হলে কি আকাশ ঘুরে আসতে হয়? সরেজমিনে চাক্ষুষভাবে তদন্ত করে দেখার জন্য কি আকাশে যেতে হবে? না তা সম্ভব নয়। সাত আসমান প্রথম আসমানের ঠিকানাও জানি না। যদিও আকাশের ঠিকানায় চিঠি দেয়ার গানের সুরে ভেসে আসে কখনো কখনো কানে। আকাশের ঠিকানা আমরা জানি না, বিজ্ঞানীরাও জানে না। নোবেল বিজয়ী ড. আবদুস সালাম এক প্রশ্নের উত্তরে তাই বলেছিলেন। যা হোক, আকাশের ঠিকানা জানা না জানার প্রশ্ন পরের কথা দুনিয়া থেকে যদি আখেরাতের সওদা আহরণ করা যায়, তাহলে জমিনে বাস করে আকাশের খবর কেন জানা যাবে না? আকাশের আলোচনায় আসার আগে দুনিয়ার কিছু খবরাখবর আমাদের জানা দরকার। আকাশে উড়াল দেয়ার জন্য যে যানই আমরা ব্যবহার করে থাকি না কেন, রানওয়ে তো থাকতে হবে। এই রানওয়ে কোথায়? তাও আমরা জানি না। তাছাড়া দুনিয়ার কিছু কথা আছে। আকাশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগে আমাদের নিয়্যাত ও আত্মপরিচয় কি সে সম্পর্কে কিছু বলার ও জানার আছে। আল্লাহপাক আমাদের কেন দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তা জানা থাকা দরকার। এসব না জানলে, মনোবল সেভাবে গড়তে না পারলে এবং আকাশ শত্র“দের সঙ্গে লড়াই করার ঈমানী হিম্মত নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করতে না পারলে আকাশ সংস্কৃতির ভাইরাসরা আমাদের চারদিকে ঘিরে ফেলবে। এখনই ঘেরাও এর মধ্যে আছি। এজন্য দুনিয়াতে আমাদের আগমন ও জিন্দেগীযাপন আর প্রস্থান সম্পর্কে যৎকিঞ্চিত জেনে নেই। নিজেকে চিনলে, নিজেকে জানলে আল্লাহকে চেনা যায়, জানা যায়। অতঃর্পহনংঢ়; দেখা যাবে আকাশের ঠিকানা পাওয়া যাবে কিনা, আগে দুনিয়া, আগে আত্মপরিচয় অতঃপর আকাশের ঠিকানা ও আকাশ সংস্কৃতি। লড়াইয়ের সীমানা ও ভিত্তি তো দুনিয়ার জমিন।
মাটি ও পানির দুনিয়ার ওপরে আছে আকাশ মহাকাশ। পৃথিবী নামক গ্রহের অবস্থাই তো আকাশে; মহাশূন্যে, মহাকাশে। আমরা দুনিয়াতে বাস করি। এই দুনিয়াতে আমাদের প্রেরণ কি স্রষ্টার নিছক খেয়ালমাত্র? না তা নয়। খেলাচ্ছলে বা নিছক খেয়ালে আল্লাহ কিছুই করেন না, যদিও একক ক্ষমতা শুধু তারই আছে, হও বললেই হয়ে যায়, সেট্হানংঢ়; ধ্বংসের ক্ষেত্রেই হোক বা সৃষ্টির ক্ষেত্রেই হোক। এমন শক্তিধর সর্বশক্তিমান যিনি, তার তো খলিফা প্রেরণের প্রয়োজন নেই, তবুও তিনি মানবজাতিকে তার খলিফা হিসেবে প্রেরণ করেছেন মানবজার্তিহনংঢ়; মধ্যে জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনিক একটা সিস্টেম গড়ে তোলার জন্য। খলিফার্দেহনংঢ়; কেন সৃষ্টি করেছেন? তার সাফ কথা, জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছি আমার এবাদতের জন্য। এবাদত কি? এবাদত হচ্ছে এই, আল্লাহর আদেশ- নিষেধ মেনে তার দেয়া জীবন বিধান অনুয়ায়ী জীবনযাপন করা। কিভাবে জীবনযাপন করতে হবে এজন্য কওমের কাছে প্রতি জনপদে। অনেকে তার আদেশ নিষেধ শুনছে আবার অনেকে শুনেনি। প্রেরিত গাইডকে নির্যাতিত করেছে, গাইড বুকও ধ্বংস করেছে। তাই তাদের এখন নৈতিক কোন বোধই নেই। যা ছিল তা অবক্ষয়ে অবক্ষয়ে শেষ গেছে। যে নৈতিকবোধ তারা নানাভাবে প্রর্দশন করে নিজেদের নীতিবান বলে বিশ্ববাসীর কাছে জাহির করছে, তা কৃত্রিম, নিজেদের মনগড়া নৈতিকতা। তারা-কাপড় পরিধান করেও থাকে দিগম্বর। সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করে বটে, সুন্দর সুন্দর সংলাপে শ্রোতাকে তারা মুগ্ধ করেও। কারণ নৈতিকতার কুদরতী সীমানা আর মানুষের তৈরি সীমানার মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক। কুদরতী হুকুমেরু কোন তোয়াক্কা তারা করেনি। ফলে শয়তানের সঙ্গে মিতালী করে এমন এক নৈতিকতা সৃষ্টি করে রেখেছে, যা অনৈতিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। নানা দিকে অবক্ষয়ের ঢল ও ধস। এমন এক পর্যায়ে অবক্ষয়ের সর্বশেষ স্তরে এবং সময়ের এই সন্ধিক্ষণে রাসূলে করীম (সা:) এর আবির্ভাব ঘটে। তার মূল মিশন কি ছিল এ সম্পর্কে নানা জনের নানা কথা আছে এবং থাকতে পারে। ব্যাখাও নানা প্রকার। তাৎক্ষনিকভাবে যদি কয়েকজন ঈমানদারদেরকে আলাদা আলাদাভাবে জিজ্ঞাসা করা যায় যে, রাসুলে করিম (সা)- এর কি মিশন ছিল এ দুনিয়াতে আগমনের? একজন বলবেন তাওহীদ ও রেসালাতের প্রতিষ্ঠা, আর একজন বলবেন নকল ইলাহদের উৎখাত করে এক আল্লাহর ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠা, আর একজন বলবেন গোমরাহির রাস্তা থেকে মানবজাতিকে সৎপথে আনা, অন্যজন বলবেন লক্ষ্যহীন ঠিকানাবিহীন এবং বিগত নবী রাসুলদের শিক্ষা আদর্শকে ভুলে যাওয়া মানবজাতির বংশধরদের বিস্মৃত সবক স্মরণ করিয়ে দেয়া আর সে শিক্ষা ও আদর্শের নবতর নিয়ামতকে বরণ করার তাগিদ দেয়া, উৎসাহিত করা ও সহায়তা করা, কেউ বলবেন সর্বক্ষেত্রে যে অবক্ষয় নেমেছিল তা প্রতিহত বা রোধ করে সংস্কতিবান মিল্লাত গঠনের জন্য মহানবী (সা)
এর আবির্ভাব ঘটেছিল। তার মিশনের অন্যতম কর্মসূচি ছিল একটি সংস্কৃতিবান জাতি গঠন করা। আমি মনে করি সকলের সকল কথা আসলে এক কথা। সকলের সকল কথার মর্মকথা একই। শব্দের পার্থক্য, বাক্যের পার্থক্য, ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সবই তাওহীদ ও রেসালাতভিত্তিক।
এজন্য যখন শুনি ‘নৈতিক মূল্যবোধর অবক্ষয়’ এই তিনটি শব্দের বাক্য, তখন চৌহাদ্দি ঠিক করে নিতে আমার কষ্ট হয়, প্রায় ক্ষেত্রেই চৌহাদ্দি ঠিক করতে পারি না। যখন কোন মোমিন মুসলমানের কন্ঠ থেকে একথা শুনি বা কলম থেকে নির্গত বাক্য পড়ি এবং জানি যে তিনি
চাপাবাজ মুসলমান নন, আমলী মুসলমান, তখন চৌহাদ্দি নির্ণয়ে ভুল হয় না। তিনি কি বলতে চান, এবং বুঝাতে চান, স্পষ্ট বুঝা যায়। একই কথা যদি একজন নাস্তিক, সেক্যুলারিস্ট, মুরতাদ এমনকি মুনাফিক মুসলমানের কন্ঠ থেকে উচ্চারিত হয় বা কলম থেকে নির্গত হয়, তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না তাদের এই উক্তির লক্ষ্য কি। কথা একই কিন্তু লক্ষ্য ভিন্ন। কথায় বলে ডাক্তারের ছুরি কাঁচি রোগীর রক্ষার বা নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা হয় আর হাইজ্যাকার আর পকেটমারের কাঁচি হাইজ্যাক আর পকেটমারার কাজে ব্যবহার করা হয়। পুলিশের বন্দুক ও পিস্তল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আর সন্ত্রাসীদের হাতের বন্দুক ও পিস্তল খুন ডাকাতি ও হাঙ্গামা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। আসল কথা, ব্যবহারের নিয়্যাত তথা লক্ষ্য উদ্দেশ্যের বিভিন্নতা। সুতরাং বলা যায় নাস্তিক, মুরতাদ আর সেক্যুলারিস্টদের ‘মূল্যবোধ, নৈতিকতা আর অবক্ষয়ের’ সংজ্ঞা ব্যাখ্যার সঙ্গে তাওহীদে বিশ্বাসীদের সংজ্ঞা ব্যাখ্যার মিল নেই। এই তো সেদিন এক নাস্তিক (মুসলিম নামযুক্ত) বন্যার ওপর মন্তব্য করতে বলায় তিনি বললেন ভয়াবহ ক্ষতিকর তার চেয়ে মৌলবাদীরা অর্থাৎ ইসলামপন্থীরা আরো ভয়াবহ ও ক্ষতিকর। বন্যার পানির চেয়ে তারা বেশি। এমন ব্যক্তির নৈতিক্হনংঢ়; মূল্যবোধ কি আর অবক্ষয়ই বা কি সে সম্পর্কে জানা বুঝার বাকি থাকেনা। কোন পথে চললে কোন ঠিকানায় আমাকে পৌঁছাবে, কোন পথের বাঁকে বাঁকে এবং মোড়ে মোড়ে কে কে আছে এবং কেন আছে তাও জানা হয়ে গেছে। অতএব নাস্তিকের নৈতিকতা ও
সংস্কৃতি আমার জন্য অনৈতিকতা ও অপসংস্কৃতি হওয়ার সেন্ট পার্সেন্ট আশংকা। এজন্য নাস্তিক আর সেকুলারিস্টরা যখন বলে ‘অনৈতিকতা ও অপসংস্কৃতি মোকাবেলা করতে হবে’,
তখন আপনাকে আমাকে বুঝতে হবে তারা ইসলামপন্থী অর্থাৎ তওহীদপন্থীদের মোকাবিলার কথাই বলছে এবং সেই সতর্ক বাণী উচ্চারণ করছে। আলোচনার মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে ঘাটে ঘাটে যেসব বাঁধা আছে তা এক এক করে ডিংগাতে বা অতিক্রম করতে হবে। বধা এবং ভুলবোঝাবুঝির আরো কয়েকটি ধাপ বা ঝোপ ঝোপ জঙ্গল সাফ করতে হবে, তবেই না আলোচনার মূল অঙ্গন নজরে পড়বে। আগেই বলেছি, আকাশ-সংস্কৃতি জানার জন্য যদি আকাশে উড়তেই হয়, তাহলে আকাশে উড়ার জন্য জমিনে যে রানওয়ে আছে তা কোথায় আমাদের জানতে হবে। ‘আকাশ সংস্কৃতি’ খুব লম্বা চরড়া বিষয় নয়, তবে এর আগে অথৈ আকাশ সংস্কৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের আগে জেনে নিতে হবে আমরা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুুত কি না, আমরা যে অস্ত্র নিয়ে লড়াই করবো তা লড়াই উপযোগী কিনা আর এ লড়াইয়ের ব্যাপারে আমাদের ধ্যান ধারনা পরিস্কার কিনা, তা জানা দরকার, বুঝা দরকার। ধারণাটা পরিস্কার করা হয় না বলে আমাদের অনেক আবেগী লোক জোশও জেদের বশবর্তী হয়ে পাল্টা কিছু করতে চান এবং কিছু কিছু করেও দেখেছেন, না ওকুল পেয়েছে না একুল পেয়েছেন। কিছুই পাওয়া যায় নি। ওরা ফ্যাশন শো করে, আমরাও করে দেখিনা আমাদের মত করে। করে দেখা গেল বাজার পাওয়া গেল না।
মহিলাদের রূপ প্রদর্শনই যখন ইসলামে নিষিদ্ধ, তখন ফ্যাশন দেশটায় কিভাবে বাজার পায়? নিতান্ত সাংঘর্ষিক। ফ্যাশন শো ইসলাম বিলাসিতা মনে করে, তাও আবার নারীর ফ্যাশন, মানে পুরুষকে প্রদর্শন। এভাবে উদাহরণ দিলে অনেক দেয়া যায়। মিসরে একবার জামাল আব্দুল নাসেরের সময় ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ নামে নৃত্য সৃষ্টি করা যায় কিনা এমন এক কসরত শুরু হয়েছিল, কিন্তু শুরুতেই এ প্রচেষ্টা শেষ হয়। সন্ত্রাসের পাল্টা সন্ত্রাস, বোমাবাজির পরিবর্তে বোমাবাজি, ছিনতাই, অপহরণ আর খুনের বদলা ছিনতাই অপহরণ আর খুন, গালির বদলে গালি, ইসলামী তা কখনও সমর্থন করে না। যেহেতু ইসলাম সমর্থন করে না তাই আমি আপনিও করি না। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ন্যায়ের অস্ত্র বহুমুখী ব্যবহারের এস্তেমাল ইসলাম সমর্থন করে। এতটুকুই শুধু বলা যায়, এর অধিক বলার বা ব্যাখ্যার অবকাশ এখানে নেই। ক্রুসেডের ডাক দিলেও আমরা জিহাদের ডাক দিতে পারছি না নানাবিধ কারণে। কৃষ্টি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অপরিচ্ছন্ন ধারণা, অস্পষ্টতা আর ভুল বোঝাবুঝি প্রচুর। কয়েকটি উদাহারণ আগে দিয়েছি। ওদের এই আছে, হরেক রকম সংস্কৃতির উপকরণ আছে, তাদের মুকাবিলা আমাদের কিছু থাকা দরকার। বিশ্বাস করুন এমন প্রশ্নও কোন এক অতি আবেগী মুসলমান আমাকে করেছেন। যাকে যেমন বুঝ দেয়া তাকে তেমন বুঝ দিয়েছি। কিন্তু কোন এক নাছোড়বান্দাকে চোখ বুঝে জবাব দিলাম, ওদের সমাজে জারজ সন্তান কিলবিল করছে, লাখ লাখ সমকামীদের উৎপাদন চাই? সেই কালচারের পৃষ্ঠপোষকতা চাই? প্রশ্নকর্তা চুপ হয়ে গেলেন উচ্চস্বরে লাহাওলাও উচ্চারণ করলেন। অন্যের বাবা দেখতে যত সুন্দর হোক তাকে আমি বাবা বলি না সাফ বিভাজন। আমার সংস্কৃতি আমার অন্যেও নয় আমার ঈমানের বলয়ের বিপরীত বলয়ের সংস্কৃতি কখনো আমার নয়। তাই সংক্ষেত্রে হলেও কৃষ্টি ও সংস্কৃতির যে ক্লাস্টার বোমা পড়বে, তা রুখতে পারবো না। আমি এখানে আমার ঈমানী বলয়ের বিপরীত বলয়ের বিশ্ববরেণ্য কোন কোন মনীষী বা পণ্ডিতের সংজ্ঞা ব্যাখ্যার উদ্ধৃতি দিচ্ছি না। এ কারণ্হেনংঢ়; দিচ্ছি না যে রসুনের সব কোষের এই মিলন স্থান একই স্থানে। আমার কৃষ্টি বা কালচার বা সংস্কৃতি কি বুঝে তারা? যাদের ঈমান আমল তাতে নেই। মুুরিস বুকাহলী দরবেশ বাদশাহ ফয়সালকে জানিয়ে ছিলেন আমি ইতিবাচক নিয়তেই বলিছ ইসলামের ওপর গবেষণা করবো।
্হনংঢ়;স্বল্পভাষী বাদশাহ ফয়সাল স্মিথ হাসি দিয়ে বলেছিলেন খুব ভাল, তাই যদি করতে চান তাহলে আগে পবিত্র কুরআনকে কুরআনের ভাষায় পাঠ করতে শিখুন অর্থ বুঝুন আরবি ভাষা শিখুন। মুরিস বুকাইলী সে উপদেশ মত পবিত্র কুরআন স্টাডি করেছিলেন এবং ইসলামকে বুঝেছিলেন। এরই ফলে অমর কয়েকটি গ্রন্থ বিশ্ববাসীকে উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুতরাং সে পর্যায়ে কোন মনীষী যদি আমাদের ঈমানের সীমানায় এসে কালচার সংস্কৃতির সংজ্ঞা দেন, তাহলে গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করা যায় । ডঃ আহমদ শরীফও বহু মন্দ কথার ফাঁকে ফাঁকে দু‘দশটা ভাল কথাও বলেছেন, কিন্তু আমরা তার ভাল কথাকেও গ্রহণ করতে পারি না, তাতে কোন না কোন ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়ে যায়। মূলের সাথে নিবিড় সংযুক্তি না থাকলে দু’দশটা মূল্যবান কথারও কোন মূল্য থাকে না, মূল্যবান কথারও কোন মূল্যয়ান হয়না। যাহোক, নিজেদের পরিচয়ের স্বচ্ছতা থাকতে হবে। তাহলে আকাশ-সংস্কৃতির কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ তা বাছাই করা যাবে। আপনার আমার কাছে যদি ঈমানের চালনী না থাকে, ঈমানের নজর না থাকে, ঈমানের মনটা না থাকে তাহলে আকাশ-সংস্কৃতির ভালমন্দ কিছুই পরখ করা যাবে না। যে দেহে রোগ প্রতিরোধ শক্তি প্রবল সে দেহে সহজে কোন রোগজীবাণু প্রবেশ করতে পারে না। আকাশ-সংস্কৃতির যত ভয়ঙ্কর ভাইরাস আছে, এসব সংস্কৃতির অনিষ্টকারিতার প্রতিরোধে আমাদের সংস্কৃতি অক্ষম, যদি নিজস্ব সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে সে চেষ্টা সাধনা না থাকে। একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, কালচার আর সংস্কৃতি এক নয়, যা কালচার তা সংস্কৃতি নাও হতে পারে। হাঁটার কালচার নরেন্দ্র মিত্রের আর আব্দুর রহীমের এক কিন্তু দু’জনের প্রার্থনা ও এবাদতের কালচার ও সংস্কৃতি এক নয়।
দু’জনের পথ চলার কালচার এক, পা ফেলেছেন এক নিয়মে তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, সন্ধ্যায় আযানের ধ্বনি ভেসে আসলো, মন্দিরেও ফাঁসার ঘন্টা বাজলো । নরেন্দ্র মিত্র বামের রাস্তায় গিয়ে ঢুকলেন মন্দিরে আর আব্দুর গিয়ে ডানের রাস্তায় একটু আগ বাড়িয়ে ঢুকলেন মসজিদে। এতক্ষন দু’জনের হাঁটার কালচার এক হলেও প্রার্থনা ও এবাদতের ক্ষেত্রে দুজনের কালচার ও সংস্কৃতির রুপান্তর ঘটে। মুসলমানের সব কালচার ও সংস্কৃতির প্রভাব থাকে। ধান থেকে চাল, চাল থেকে ভাত তৈরির কালচার সকলেরই এক, এমনকি খেতে বসেও একভাবে, কিন্তু মুসলমান খাবার মুখে নেয়ার সময়্হনংঢ়; বিসমিল্লাহ বলে, সামনে আহার্য বস্তু মনে করে রাজ্জাকের দেয়া রিজিক, নিয়ামত। এগ্রিকালচারের দ্বারা উৎপাদিত ফসল সকল ধর্মের লোকের কাছে আসে একইভাবে কিন্তু ভোগের বেলায় ভোগ হয়ে যায় সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত। এক কথায় মুসলমানরা সকল কালচারকে তাদের ঈমানী সংস্কারের আগুনে কালচারে যা খাদ থাকে তা পুড়ে ছাই হয়ে যায় যা থাকে তা ঈমানী কষ্টিপাথরে বাছাই করে যা গ্রহণ করে থাকে তা মুসলসমানদের সংস্কৃতি। সকল ধর্ম যেমন এক নয়, সকল ধর্মাবলম্বীদের সংস্কৃতিও এ নয়। প্রত্যেক ধর্মাম্বলবীদের কাছে সংস্কৃতি নির্ণয়ের কষ্টিপাথরও নেই। আর নেই বলেই যা চকমক করে ঝকমক করে, তাকেই সংস্কৃতির সোনা বলে, যেমন
আচার্য কিছু দেখলেই পূজাই লেগে যায়, গাছ, বাঁশ, সাপ, পাথর, সূর্যকে এমনকি বট গাছকেও অলৌকিকতায় মণ্ডিত করে পূজা করে। বর্তমানে আকাশ-সংস্কৃতির বড্ড জোর। বিশ্বের প্রত্যেক দেশ এই সংস্কৃতির হাওয়ায় ভাসছে। তরুণরা আবেগে থরথর করে কাঁপছে। আকাশ-সংস্কৃতির সওদা সিডি ও ক্যাসেট আকারে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দোকানে ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে এসব সওদার মূল্য অতি কম কিন্তু মুগ্ধ করার, সম্মোহিত করার আছর থাকে বেশি। ঘরে ঘরে টিভি ও অন্যান্য যন্ত্র প্রবেশ করছে। পত্র পত্রিকায় বিভিন্ন চ্যানেলের নাম প্রোগ্রাম রোজ ছাপা হয়। দিনরাতের প্রতিটি মুহূর্তে চিত্তক বিনোদিত করার ব্যবস্থা আছে। বিনোদনের কি আইটেম আপনার চাই? হাতের কাছে রিমোট কন্ট্রোল মেশিন আছে। বোতাম টিপতে থাকুন একটার পর একটা। তাতে ভালও পাবেন মন্দও পাবেন। ভালমন্দ সংজ্ঞার ব্যাখ্যা আপনার কাছে। দিগম্বর নৃত্য থেকে শুরু করে যা চাইবেন পাবেন। পবিত্র কুরআন তেলয়াত শুনে যদি রাত শেষ করতে চান তাও মজুদ আছে। আপনার রুচি অভিরুচি আপনার কাছে। যীনা শব্দ উচ্চারণ করলে শব্দটি যেভাবে আপনার আমার সামনে পূর্ণ অবয়বে আসে, তাই যথেষ্ট, ব্যাখ্যায় গেলে দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতেক্যটা শব্দের মধ্যেই ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে। অনেক শব্দের ব্যাখ্যা করা যায় না। যেমন করে লুটেছে তা কুৎসিত। তেমনিভাবে পশ্চিমাদের বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে সংস্কৃতি নামের বিভিন্ন অপসংস্কৃতি তৈরি করে বিশ্বময় রপ্তানি, করছে কেউ কেউ আমদানিও করছেন। যত অশ্লীলতা আছে কুৎসিতদের জন্য কুৎসিত বিনোদন আছে সবই সরবরাহ করছে সরকারি এবং সিডিত্হেনংঢ়; বন্দি করেও। অনিবার্য কারণে আমি এসবের ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। ব্যাখ্যা করতে গেলে রঙ, রস পদ্ধতি প্রত্রিয়ারও ব্যাখ্যা করতে হয় তা কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ইফসুফ (আ) এর পিছন দিক থেকে মহিলা জামা টেনে ধরেছিল। পবিত্র কুরআন এতটুকু বলেছে। ব্যাখ্যায় যায়নি। আক্কেলমন্দরা মহিলার মটিভ বুঝে নিতে কষ্ট হয়নি।
পশ্চিমাদের ফ্যাক্টরীগুলেতে আকাশ সংস্কৃতি বিভিন্ন আইটেম তৈরি করে। গত্হনংঢ়; শতাব্দীর আশির দশকে যখন লাতিন আমেরিকার ওপর চাপিয়ে দিয়ে একসপেরিমেন্ট করে তখন লাতিন আমেরিকার প্রত্যেক দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলেছিল, কিন্তু তাদের কাছে সংস্কৃতি যাচাই বাছাইয়ের যন্ত্র না থাকায় এক পর্যায়ে উত্তেজনা থেমে যায়। ঠান্ডা হয়ে যায়, এখন লাতিন আমেরিকা খুশির বন্যায় সাতাঁর কাটছে। আমাদেও দেশেও যখন পশ্চিমা অপসংস্কৃতির এ বন্যার গলিজ পানি ঢুকতে থাকে তখন দেখা গেল শহর বন্দরের প্রত্যেক অলিগলিতে ভিডিও ক্লাব ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়েছে। বেশকিছু দিন ধরে পাকড়াও চললো তারপর কি যেন একটা সমঝোতা হয়ে গেল। এখন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হচ্ছে রাতের কোন প্রহরে কি দেখা যায় বোতামে টিপ দেয়ামাত্র। সরকারের কোন মাথা ব্যথা নেই দেশের যুবসমাজ ও কিশোর কিশোরীরা উৎসন্নে যাচ্ছে, কিছু একটা করা দরকার। আপত্তিকর পরিবেশনায় বদঅভ্যস্ত চ্যানেলগুলো বন্ধের পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যেন প্রেসার গ্র“প প্রেসার দিয়ে সিন্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতা ধ্বংস করে দিয়েছে।
ভারতের চ্যানেলে বাংলাদেশের চ্যানেল দেখায় না। ভারতের আকাশ বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর জন্য বন্ধ অথচ ভারতের কোন কোন চ্যানেলের একটি নাটকও কখন সম্প্রচাণ করা হবে তা বাংলাদেশে সময়সহ বিজ্ঞাপনে প্রচার করা হয়।
আকাশ সংস্কৃতি আমাদের নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটাচ্ছে কিভাবে ব্যাখ্যার বোধহয় কোন প্রয়োজন নেই। নগ্নতা যৌনতা ছাড়া তো তাদের কাছে কিছুই নেই। এই দুয়ের প্রমাণ তো যতভাবে পারে ঘটাচ্ছে তারা তত আকাশের বাজার দখল করতে সক্ষম হয়েছে। আমি ইচ্ছা করেই এই বর্ণনায় গেলাম না। অপসংস্কৃতির প্লাবনের মধ্যেও কোন কোন মুসলিম দেশ সেন্সর করে আকাশের এ সওদা গ্রহণ করে বা প্রত্যাখ্যান করে। কারণ প্রত্যেক দেশের কাছে এই আর্ন্তজাতিক নেটওর্য়াকের লোকাল কন্ট্রোলিং ব্যবস্থা আছে। যা আপত্তিকর বলে মনে করা হবে তা প্রদর্শন করার হুকুম শক্তভাবে দেয়া যায়। ভারত যেমন কওে পারছে, যেমন করে ইরান ও সউদী আরব পারছে। আমরা কেন পারবো না?
নগ্নতা বিরুদ্ধে একটা ঘৃণাবোধ সৃষ্টির জাতীয় আন্দোলন অপরিহার্য। ছাত্র সমাজের মধ্যে এই জাগরণ যদি আসে তাহলে আন্দোলনটা সফল হয়। নৈতিক বোধ শক্তি শিক্ষা ও অনুশীলন ছাড়া এই ভাইরাস বন্ধ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে এই ভাইরাস প্রতিরোধে একটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।্হনংঢ়; সেটা হলো এই অপসংস্কৃতির কেউ মনে প্রাণে পছন্দ কওে না। আল্লাহর রাসূলের না পছন্দের আর পছন্দের দিকটি যতবেশি প্রচারে আসবে শিক্ষায় আসবে আমলে অনুশীলনে আসবে এই আসমানী বালা- মুসিবত থেকে বাঁচার ব্যবস্থা হবে, নতুবা পরিত্রাণ নেই। হ্যাঁ আশার কথা খুব দুর্বল হলেও বিপরীত একটা স্রোত একটা হাওয়া সৃষ্টির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আশা শুধু এই আমাদের ইমানের তেজই আমাদের হেফাজত করতে পারে।