মঙ্গলবার, ৮ মার্চ, ২০১১

বাদশা মিয়া জুবায়ের হুসাইন


আকাশের দিকে তাকালেন বাদশা মিয়া। ভেবেছিলেন খোলা আকাশ দেখবেন। কিন্তু এই শহরে খোলা আকাশ দেখার আশা করা ডুমুরের ফুল দেখার মতো। প্রতিনিয়ত এক সারি ইটের মাঝে সিমেন্ট-বালির মিশ্রণ ঢেলে আরেক সারি ইট গেঁথে তৈরি হচ্ছে আকাশচুম্বি অট্টালিকা। সেখানে কোথায় আসমানি আকাশের দর্শন?
কারেন্টের তারের ওপর বসে ছিল কয়েকটা কাক। তাদেরই একটার বুঝি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার সময় হলো তখন। ‘টপ’ করে উষ্ণ পদার্থটুকু এসে পড়ল বাদশা মিয়ার কপালের ঠিক মাঝখানটিতে। চুন বর্ণের ওই পদার্থ তখন বেয়ে নিচে নামতে শুরু করেছে।
ভ্রƒ কুঁচকে ফেললেন বাদশা মিয়া। বাম হাতটা উঠিয়ে নেয়ার আগে একটু অন্যরকম উষ্ণতা অনুভব করলেন এই প্রচন্ড  গরমের মধ্যেও। পড়ন্ত বিকেল, কিন্তু গরম কমার নাম নেই।
ভেজা পদার্থটা বাম হাতের আঙুলে লাগিয়ে চোখের সামনে ধরলেন। মুহূর্তে কুঁচকে ফেললেন কপালের চামড়া। বিশ্রি গন্ধ বের হচ্ছে ওটা থেকে। নাকমুখ এমনিতেই কুঁচকে গেল তার। ইচ্ছা করল গলার সমস্ত জোর কণ্ঠনালীতে এনে মনের সমস্ত ঝাল মিটিয়ে গালাগাল করে ওই হতচ্ছাড়া কালো পাখিগুলোকে। কিন্তু কী মনে হতে তা আর করলেন না। হয়তো ভাবলেন, ওরা তো আর আগেপিছে ভেবে কিছু করেনি। ওরা তো জানে না যে এই সাদা পদার্থটুকু দুর্গন্ধ ছড়ায় আর মানব জাতির নাক কুঁচকানোর বিষয়ে পরিণত হয়। তাছাড়া ওরা তো অবুঝ জীব। যেখানে বুঝওয়ালা মানুষই নানা সময়ে নানা অকাজ করে যেগুলো তার দ্বারা সম্পন্ন হওয়া শোভা পায় না, জেনে-শুনে-বুঝেই অপরজনকে কষ্ট দেয়- সেখানে কাক নামের ওই সামান্য পাখি মামুলি এ কাজটা করেছে অর্থাৎ কোথাকার কোন্ বাদশা মিয়ার চার আঙুল সমান কপালটাকে ‘ইয়ে’ করে দিয়েছে, এটা নিয়ে ভাববার সময়ইবা কই?
আশেপাশে টিউবওয়েল খুঁজলেন। নাহ্, নেই। কাগজ খুঁজলেন। তাও পেলেন না। পাশের দেয়ালে কিসের যেন পোস্টার সাঁটা আছে। সেখান থেকে কাগজ ছিঁড়ে নিলেন। হাত ও কপাল মুছে ফেললেন। কিন্তু তাতেও মনে স্বস্তি পাচ্ছেন না। বমি বমি আসছে তার। কাকের ইয়েতে এতো দুর্গন্ধ তা তিনি আগে জানতেন না। আর জানলেও বা কী হতো? না, কিছুই হতো না। তিনি পারতেন না আজকের এই ঘটনাটা এড়াতে। হয়তো পারতেন। কীভাবে? হ্যাঁ পারতের যদি একটা পাজেরো গাড়ি তার থাকত। আর পাজেরো না হলেও অন্তত যদি তারই কলিগ মতিন চৌধুরীর মতো একটা সেকেন্ডহ্যান্ট ট্যাক্সি-কারও থাকত। নাইবা থাকল পাজেরো বা মতিন চৌধুরীর মতো সেকেন্ডহ্যান্ড ট্যাক্সি-কার, বাদশা মিয়া যদি নিদেনপক্ষে একটা রিকশা করে বাড়ি ফিরতে পারতেন তাহলেও এটা এড়াতে পারতেন। সত্যিই কি পারতেন এড়াতে?
বাদশা মিয়া এসব নিয়ে আর ভাবতে চান না। মাথাটা কেমন ঝিম ধরে আসে। দুপুরে আজ কেবল দু’টো সিঙারা দিয়ে লাঞ্চ সেরেছেন তিনি। পেটটা তাই একটু কেমন যেন চিনচিন করছে। বাঁ-পাশটায় কী একটা নড়ে নড়ে উঠছে। বাদশা মিয়া আশঙ্কা করছেন এটা এসিডিটির কারণেই হচ্ছে। বেশ কয়েকদিন যাবৎ বিষয়টা লক্ষ্য করছেন তিনি। তিনি ঘুণাক্ষরেও কখনো ভাবেননি যে তার কোনোদিন এসিডিটি হবে।
বাদশা মিয়া অফিস করে বাড়ি ফিরছিলেন। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন তিনি। বেতন মিডিয়াম কাসের। তাতে ভালোই চলে যায় তার। কিন্তু জিনিসপত্রের অসহনীয় মূল্য বৃদ্ধিতে এখন আর তিনি পেরে উঠছেন না। ওদিকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচও বেড়ে গেছে। ভালো কোনো স্কুল বা কলেজে পড়াতে গেলেই মাস গেলে একগাদা টাকা গুনতে হচ্ছে। বেতনের সিংহভাগটাই এখন ব্যয় হয়ে যায় ছেলেমেয়েদের পেছনে। ইদানীং আরেকটা বিষয় তাকে প্রচন্ড ভাবে পীড়া দিচ্ছে। তিনি অপাত্রে তার শ্রম-অর্থ ঢালছেন নাতো? বড় হয়ে ছেলেমেয়েগুলো তাকে দেখবে তো? যে হারে পারিবারিক বন্ধন এদেশে ভেঙে পড়ছে, তাতে তার এ আশঙ্কাটা কি একেবারেই অমূলক?
বাদশা মিয়া ভাবেন, বর্তমান সমাজের যাবতীয় অসামাজিক কর্মকান্ডের মূলে এই পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা। এখন যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, না বললেও সবাই একবাক্যে যে বিষয়টির দিকে অঙুলি নির্দেশ করবে, তা হলো ইভটিজিং। বাদশা মিয়া ভাবেন, কোত্থেকে এলো এই নোংরা জিনিসটা? তাদের সময় তো এটা ছিল না। কিংবা থাকলেও সেটা চোখে পড়ার মতো ছিল না। আসলে ইভটিজিং হচ্ছে সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করার একটা কৌশল মাত্র। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুসরণই দেশের তরুণ সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে ওইসব নোংরামির দিকে। যদি পরিবার থেকেই একজন সন্তানকে ঠিকভাবে শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলা হতো, তাহলে চিত্রটা কেমন হতো? ঠিক তাদের আদর্শপাড়া গ্রামটার মতোÑ ভাবেন বাদশা মিয়া। আর ভাবেন, এখনও এই অবস্থা থেকে হয়তো উত্তরণ সম্ভব, যদি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।
আর কত কী সব মাথায় ঢুকে চিন্তাটাকে তালগোল পাকিয়ে দিতে লাগল বাদশা মিয়ার। তাই আর ভাবতে চাইল না। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, এবং এটাই চান, তার সন্তানরা তাকে নিরাশ করবে না। তাদেরকে তিনি সেভাবেই গড়ে তুলছেন ছোটবেলা থেকেই।
একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন বাদশা মিয়া। নিঃশ্বাসের সাথে কেমন গরমের হলকা বের হলো বলে মনে হলো। একটু যেন চমকালেন তাতে। নিজের অজান্তেই ডান হাতটা উঠে গেল কপালে। হাতের কব্জির এপিঠ-ওপিঠ দিয়ে শরীরের তাপ অনুভব করার চেষ্টা করলেন। একটু গরম ঠেকল না? হ্যাঁ, গরমই তো! বাদশা মিয়া বুঝলেন তার জ্বর আসছে। গরমের শরীরে ঘাম জমে ঠান্ডা লেগে গেছে। নাকের মধ্যে কেমন সুরসুর করে উঠল। কয়েক সেকেন্ড পর বিকট শব্দে একটা হাঁচি বেরিয়ে এলো। তারপরই নাক দিয়ে তরল পদার্থ বের হতে লাগল।
জ্বরের সাথে সর্দিও শুরু হয়েছে বাদশা মিয়ার। 
বাদশা মিয়ার এখন পকেট খালি। যাকে বলে ঐধৎফ ঁঢ় হড়।ি তাই ভয়ানক দুশ্চিন্তাতে ভুগছেন তিনি।
এই একটু আগে ঘটেছে ঘটনাটা।
বেলা চারটা পর্যন্ত অফিস করে সিএনজি করে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছিল।
কয়েক বছর ধরে এক জায়গায় কিছু টাকা জমাচ্ছিলেন তিনি। মাঝে বাদ দিয়েছিলেন, মানে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাই ওটার কথা আর মনেও ছিল না। আজই ওরা এসে টাকাটা দিয়ে গেছে। সে কারণেই আজ তার আনন্দ লাগছিল আর দ্রুত বাড়ি ফেরার জন্য সিএনজিতে চড়ে বসেছিলেন তিনি।
বাদশা মিয়ার মনের মধ্যে এখন একসাথে অনেকগুলো অপূরণীয় স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্নগুলো দেখে আসছেন তিনি। সেগুলো ক্রমান্বয়ে ডালপালা বিস্তার করতে করতে ছড়িয়ে গেছে সমস্ত দেহের মধ্যে। সেই সকল ডালপালা তিনি এক এক করে ভরে দেবেন, তবে পাতা বা ফুল-ফল দিয়ে নয়, সুপ্ত আশাগুলোকে বাস্তবে রূপ দান করে। সেটাও অবশ্য এক প্রকার সবুজ পত্রপল্লব আর পুষ্প ও ফলাদি দিয়ে ডাল ভরে দেয়ার মতোইÑ ভাবলেন বাদশা মিয়া।
অথচ...
শহরটা এখন বেশ ব্যস্ত। অথচ তিনি যখন প্রথম এসেছিলেন এই শহরে, তাও আজ থেকে প্রায় পাঁচ-সোয়া পাঁচ বছর হবে, তখন শহরটা এত ব্যস্ত ছিল না। বেশ শান্ত আর ছিমছাম ছিল রাস্তাঘাট, অলিগলি। নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছা না গেলেও এখনকার মতো অনির্দিষ্ট সময় লাগত না। প্রায় প্রতিটা রাস্তার মোড়েই জ্যাম লেগে থাকে। দেখলে মনে হয় একদল পিঁপড়ে চলেছে একজন সঙ্গীর সন্ধান দেয়া কোনো খাদ্য বয়ে বাসায় আনতে, আগামী দিনের সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে। অথবা ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতার দৃশ্যের কথা তাৎক্ষণিকভাবে মাথায় চলেও আসতে পারে।
এমনই এক জ্যামে পড়েছিলেন বাদশা মিয়া।
খোশ মেজাজে মনে মনে পুরনো দিনের একটা বাংলা গান ভাজছিলেন তিনি। তাই খেয়াল করে পারেননি সিএনজি চালক কখন তার মোবাইলে কথা সেরে নিয়েছে।
সবুজ বাতি জ্বলতেই আবার গাড়িগুলো চলতে শুরু করল। কিছু পথ যেয়ে আবারও সিগন্যাল। অবশ্য এবারেরটা তাড়াতাড়িই ছেড়ে গেল। আর একটু পথ যেতেই ঘটল ঘটনাটা, বাদশা মিয়ার জীবনে এই প্রথম...
সিএনজি ড্রাইভার হঠাৎ একটু সেøা করে ফেলল তার সিএনজি। রাস্তার দু’পাশ থেকে হাজির হল আরও জন চারেক লোক। এসে ঘিরে ধরল বাদশা মিয়াসহ তার সিএনজিকে। দু’পাশ থেকে দু’জন উঠেও পড়ল।
ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলেন বাদশা মিয়া। বললেন, ‘এ্যা..এ্যা..এ্যাই, কী চাও তোমরা? গাড়িতে উঠে পড়লে যে! এটা তো আমি ভাড়া করেছি।’ আরও কী সব বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাকে মাঝপথেই থেমে যেতে হলো, বরং বাধ্য হলেন থেমে যেতে। কেননা, তার কথার জবাবে লোকগুলোর একজন ধারালো চকচকে ছুরির ফলা ও একজন পিস্তলের বাট দেখালো তাকে, অত্যন্ত নরমভাবে, অথচ হিংস্রতার সাথে।
ভীষণভাবে চমকে উঠলেন বাদশা মিয়া। তোতলাতে লাগলেন, ‘এ.. এ.. এ.. এ কী! কারা তোমরা? দে.. দে.. দেখ, আ.. আ..মি কিন্তু এসবের দারুণ ভয় পাই!’
ওদের মধ্যে এবার একজন বলে উঠল, ‘তাইলে কোনো কথা না কইয়া যা আছে সব দিয়া দাও তো চান।’
‘মা.. মা.. মানে?’ ঢোক গিললেন বাদশা মিয়া।
পূর্বের জনই বলল আবার, ‘ন্যাকা! কিছু বুঝবার পারছ না, তাই না? বের কর শালা যা আছে।’ পিস্তলের নল নাচালো সে এবার। আর তাতে ‘কোত্’ করে একটা ঢোক গিললেন বাদশা মিয়া।
‘ঠি.. ঠি.. ঠিক আছে, দিচ্ছি সব। আগে ও.. ওগুলো সরিয়ে নাও..।’ বললেন তিনি।
বাদশা মিয়া এরপর উঁকি দিয়ে বাইরে তাকাতে চাইলেন, যদি পুলিশ বা এই জাতীয় কাউকে পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি মুখ বাড়াতে যেতেই চাপাকণ্ঠে গর্জে উঠল লোকটা,  ‘কোনো চালাকির চেষ্টা কোরো না মিয়া। জলদি কর।’
নিজের কাছে যা ছিল সব বের করে দিলেন বাদশা মিয়া। বরং বলা যায় লোক দু’টো ছিনিয়ে নিল সব।
সব কিছু নেয়া হয়ে গেছে, যখন ভাবল লোকগুলো, তখন একজন বলল, ‘শালা কোনো গ্যান্জাম করবি না। সোজা চইলা যাবি। একবারও পেছন ফিইরা তাকাবি না। যদি তাকাস্, তইলে কলাম...’ হাতের ছোরাটা বিশেষ ভঙ্গিতে নাচাল।
বাকিটা আর না বললেও বুঝে নিলেন বাদশা মিয়া। তাই দ্রুত নেমে গেলেন সিএনজি থেকে। তারপর গলিপথটা ধরে হাঁটা ধরলেন। অনেক কষ্টে পেছন ফিরে তাকানো থেকে নিজেকে সামলে রাখলেন।
মনটা তার গুড়িয়ে যাচ্ছে অসহ্য বেদনায়। সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন তিনি। কপর্দকশূন্য। সারা দেহটা থরথর করে কেঁপে উঠল। গায়ের বল হারিয়ে ফেলছেন তিনি।
গলিপথটা বাঁক নিতেই আর ধৈর্য ধরতে না পেরে পেছন ফিরে তাকালেন তিনি। না, নেই সিএনজিটা। সেখানেই সেভাবে  দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি।
মনে হল বিশাল আকাশটা তার মাথার উপর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। টলছেন তিনি। পা দু’টো অসাড় হয়ে আসতে চাইছে। তাল সামলাতে ফুটপাথে বসে পড়লেন। দু’হাত দিয়ে চেপে ধরলেন মাথা। ওখানকার, কপালের দু’পাশের রগ দু’টো দপ্দপ্ করে লাফাচ্ছে। তলপেটের নিচে চিনচিন করে ব্যথা করে উঠল হঠাৎ। সেইসাথে ঘাড়ের পেছনটাতেও মৃদু চিনচিনে ভাব উপলব্ধি করলেন।
‘উহ্!’ আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি। তার সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত আশা, সমস্ত চাওয়া নিমিষেই গুড়িয়ে গেছে। কতদিন ধরে দেখতে থাকা স্বপ্নটা বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছিল, হঠাৎ করেই সব আবার শেষ হয়ে গেল।
চোখ জোড়া ঝাঁপসা হয়ে আসতে চাইছে। তবে প্রবল মানসিক শক্তির অধিকারী বাদশা মিয়া অবশেষে উঠে দাঁড়ালেন। এভাবে ভেঙে পড়লে তো আর হবে না। তাকে চলতে হবে। তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা পথ চেয়ে আছে।
বাদশা মিয়া প্রবলভাবে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন। যে সৃষ্টিকর্তা তাকে সৃষ্টি করেছেন, এতদিন ধরে একান্ত মেহেরবানী করে বাঁচিয়ে রেখেছেন, সেই সৃষ্টিকর্তা তাকে নিরাশ করতে পারেন নাÑ এ বিশ্বাসটুকু তার আছে। আজ একটু আগে যে ঘটনাটা তার জীবনে ঘটে গেল, তার পেছনেও নিঃসন্দেহে কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। তাই ভাঙতে ভাঙতে ভাঙলেন না বাদশা মিয়া।
চলতে লাগলেন তিনি। চলাই যে এখন তার সম্বল। আর কিছুদূর হাঁটার পর যখন তিনি উপরের দিকে তাকিয়েছেন মাথার উপরের নীল আকাশটা দেখতে পাবার প্রত্যাশায়, তখনই কাকটা প্রাকৃতিক কর্ম সেরে নিয়েছে।
শীত করছে বাদশা মিয়ার খুব। তারমানে জ্বরের বেগ বাড়ছে। এই একটু আগেও তিনি ঘামছিলেন ছিনতাইকারীদের শিকারে পরিণত হওয়ার সময়। এমনকি যখন সিএনজিতে করে আসছিলেন, তখনও। আর এখন তিনি রীতিমতো কাঁপছেন, প্রচন্ড শীত তার সমস্ত দেহকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এখনও বেশ কিছুটা পথ তাকে যেতে হবে। তাই চলার গতি বাড়িয়ে দিলেন।
‘আরে বাদশা না? তাইতো, বাদশাই তো। এ্যাই বাদশা?’
থমকে দাঁড়ালেন বাদশা মিয়া। কে তাকে নাম ধরে ডাকে? ‘কে?’ মুখ তুলে তাকালেন তিনি। মুহূর্তে হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। অস্ফূটে বলে উঠলেন, ‘আরে রাজা যে!’
রাজা বললেন, ‘হ্যাঁ বন্ধু আমি। তা কী ব্যাপার? তুমি এই অসময়ে হেঁটে কোথায় যাচ্ছ?’
‘বলব সব, আগে চল কোথাও গিয়ে বসি।’ এক্ষণে মনে বেশ বল পাচ্ছেন বাদশা মিয়া।
তারা দু’জন নিরিবিলি একটা জায়গা দেখে বসে পড়লেন। তারপর বাদশা মিয়া শুরু করলেন একটু আগে ঘটে যাওয়া তার জীবনের তীক্ত অভিজ্ঞতার কথা।
রাজা ও বাদশা দু’জন ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। একই স্কুল, একই কলেজ ও ভার্সিটিতে পড়ালেখা করেছেন তারা। তারপর রাজা শুরু করেছেন ব্যবসা আর বাদশা প্রাইভেট কোম্পানিতে ঢুকেছেন। এরপর কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। মাঝে মাঝে ফোনে আলাপ ছাড়া সরাসরি কথা হয় না বললেই চলে। অনেক দিন পর আজ আবার মিলিত হয়েছেন দু’বন্ধু। কিন্তু একটা বিমর্ষ ভাব বিরাজ করছে। রাজা চাইলেন পরিবেশটা হালকা করতে। কিন্তু বাদশা কিছুতেই হালকা হতে পারছেন না। কিভাবেই বা হবেন?
রাজা বললেন, ‘দোস্ত, তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। এক কাজ কর, কাল একবার আমার সাথে দেখা কর। দেখি কী করা যায়।’
‘মানে?’ বাদশা মিয়া কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে রাজার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
‘আরে দোস্ত, বিপদে যদি কাজেই লাগতে না পারলাম তো কিসের বন্ধু, অ্যাঁ?’
‘কিন্তু...’
‘কোনো কিন্তু নয়। এখন বাড়ি যাও। আর শোনো, ভাবিকে কিছু বলার দরকার নেই। পরে আমিই সব বুঝিয়ে বলব। ও.কে?’
‘ঠিক আছে, তুমি যখন বলছ।’
একটা রিকশা ডেকে তাতে বাদশাকে মিয়াকে উঠিয়ে দিলেন রাজা। তাকে কিছু টাকাও দিয়ে দিলেন।
বাদশা মিয়া রিকশায় করে বাড়ি ফিরে এলেন। হাজার চেষ্টা করেও স্ত্রীর সামনে স্বাভাবিক হতে পারছেন না। তবে তাকে কিছু বুঝতেও দিলেন না। স্ত্রীর কথায় ‘হু-হ্যাঁ’ করে সায় দিয়ে গেলেন শুধু।
বাদশা মিয়া জানেন রাজা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি এবং ভালোভাবে। রাজা যে ব্যবসা করেন তার সম্পর্কে একেবারে সবকিছুই না জানলেও যেটুকু জানেন তাতেই তার প্রকৃতি সম্পর্কে অনুমান করে নিতে পারেন। ভাবছেন তার কাছ থেকে সহযোগিতা নেয়া ঠিক হবে না। আবার নিজের অবস্থা সম্পর্কেও ভাবছেন। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে তিনি পারছেন না। দারুণ অস্বস্তিতে ছটফট করছেন। ঘুম আসছে না।
স্ত্রী আয়েশা বানু খেয়াল করলেন বিষয়টা। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে তোমার? অমন করছ কেন?’
‘উঁ! না, কিছু না।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন বাদশা মিয়া।
‘আমার কাছে লুকাচ্ছ কেন? বল না কি হয়েছে তোমার?’ আয়েশা বানুও নাছোড়বান্দা।
বাদশা মিয়া চুপ রইলেন।
আয়েশা বানু বললেন, ‘অফিসে কিছু হয়েছে?’
‘না।’
‘তবে? তোমাকে এমন চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?’
বাদশা মিয়া সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না সব তাকে বলা ঠিক হবে কি না। এ জগতে তার স্ত্রীই তার সবচেয়ে কাছের মানুষ, শুভাকাক্সক্ষী, বন্ধু। পরম হিতৈষী, বিপদে ব্যথার গায়ে সুখের পরশ লেপনকারী।
কাজেই তাকে বোধহয় সব বলা যায়।
মনস্থির করে ফেললেন বাদশা মিয়া। পাশ ফিরলেন।
‘বল কী? (!)’ সব শুনে বললেন আয়েশা বানু।
‘এখন আমি কী করব তুমিই বলে দাও। আমি.. আমি...’ কথা হারিয়ে ফেলেন বাদশা মিয়া।
আয়েশা বানুও কিছু বলতে পারেন না খানিকক্ষণ। তারপর বললেন, ‘যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন যদি তুমি ভেঙে পড়ো তাহলে ছেলেমেয়েদেরকে সান্ত¡না দেবে কে?’
‘কিন্তু আমি তো ওদেরকে কথা দিয়েছি! এখন কী করব?’
একটু ভাবলেন আয়েশা বানু। তারপর বললেন, ‘সে দায়িত্ব আমার উপর ছেড়ে দাও। আমিই ওদেরকে বুঝিয়ে বলব।’
‘কী বুঝিয়ে বলবে তুমি?’
‘ওসব তোমাকে ভাবতে হবে না।’ বললেন আয়েশা বানু।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বাদশা মিয়া। বললেন, ‘যাক, একটা দুঃশ্চিন্তা থেকে আমাকে বাঁচালে। কিন্তু...’
‘আবার কিন্তু কিসের? এখন ঘুমাও। কাল একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
‘কিন্তু কী ব্যবস্থা করবে তুমি?’
‘আমার উপর তোমার বিশ্বাস নেই?’
‘এ কথা কেন বলছ? তুমি ছাড়া কে আমাকে ভালো বোঝে বল? তুমি পাশে আছো বলেই তো আমি এতটা পথ পাড়ি দিতে পেরেছি। আমি নিশ্চিন্ত থেকেছি তোমার উপর ভরসা করে।’
‘যাহ্। তুমি একটু বাড়িয়েই বলছ।’
বাদশা মিয়া একটু হালকা হলেন। এবার নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন।
রাজার কাছে হাত পাতার ইচ্ছা তারও ছিল না। বাধ্য হয়েই সে কাজ করতে যাচ্ছিলেন তিনি। এক্ষণে মনে হচ্ছে বুকের ওপর থেকে ইয়া বড় এক জগদ্দল পাথর নেমে গেছে।
চোখ জোড়া আপনাতেই বুজে এলো তার।

কেমন আছেন ঃ ভাল আছি - জহুরী



আপনি কেমন আছেন ?
- ভাল আছি।
- আপনি কেমন ?
- ভাল।
আমাদের সমাজ জীবনে যে কোন পরিচিতি দু’জনের  মধ্যে দেখা সাাৎ ঘটলে সালাম/ আদাবের পর কুশলাদি জিজ্ঞাসা এভাবেই শুরু হয়। দু’জনই ‘ভাল’ আছেন ‘মন্দ’ কেউ নেই। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, সবাই যদি ভালই থাকেন তাহলে মন্দের ছড়াছড়ি কেন? যাদের দেহে ভেজাল খাদ্যদ্রব্যের জের, পেটে গন্ডগোল,অপুষ্টিতে চর্মসার, সারা দেহে চুলকানি, দশ আঙ্গুলের দশখানা নখের লাংগল মজলিসে বসে যেমন চলে, তেমনি চলে শয়নে স্বপনে। এমন অসুখী ব্যস্ত একজন লোককে তামাশা করে জিজ্ঞাসা করেই দেখুন না, তিনি কেমন আছেন? মনের অজান্তে স্বাভাবিক কন্ঠেই তিনি বলে ফেলবেন, ‘ভাল আছি’। এক ভিুককে অন্য চেনা এক ভিুক যখন জিজ্ঞাসা করে ‘কেমন আছ মিয়া’ ফুড়–ৎ করে জবাব আসে,‘ আল্লাহ ভালই রাখছে’। অভাবের তাড়নায় আর মনের আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেজন পাগলের মত শান্তি তালাশ করে দিক থেকে দিগন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তিনিও  প্রশ্নের একই উত্তর দেন ‘ভাল আছি’। যিনি ঋণে হাবুডুবু খাচ্ছেন,টেনশনে টেনশনে নিঃশেষ হচ্ছেন, তাকে জিজ্ঞাসা করলে ঐ একই জাবাব পাওযা যাবে ‘ ভাল আছি’। স্বামী হারা বিধবা স্ত্রী, তার অভুক্ত কংকাল সার সন্তানকে বুকে ধরে অন্য বিধবার কুশল জিজ্ঞাসার জবাবে বলেন ‘ভাল আছি’। ুধার জ্বালায় যেসব নিরন্নের বুক ফাটা হাহাকার সদা উদগত হচ্ছে, তাদের কন্ঠেও ‘ভাল থাকার’ কথা শুনা যায়। অরণীয় কন্যার বাবা বহু চেষ্টা তদবীর করে কন্যা সম্প্রদানের একটা সুযোগ পেয়েছেন; কিন্তু তাও মোটা অঙ্কের যৌতুকের বিনিময়ে। বিয়ের আর বেশি দিন বাকী নেই, এখনও অর্থের টাকা সব যোগাড় হয়নি। কন্যার বাবা পাগলের মত টাকা সংগ্রহের জন্য চেনা-অচেনা সব জায়গায় ধর্না দিচ্ছেন। দারুণ দুঃশ্চিন্তা। পথে হল পড়শীর সাথে দেখা। পড়শী শুধালেন,কেমন আছ জয়তুনের বাপ? কন্যার বাবা বুক ভরা ব্যথা আর সীমাহীন দুঃশ্চিন্তা নিয়েও কেমন করে যেন জবাব দিয়ে দিলেন ‘ভাল আছি’ ভাই। ও পাড়ার জমির আলী সাহেব দু‘দিন আগে তার কিশোর ছেলেকে কবরে শুইয়ে রেখেছেন। তাকেও দেখলাম একজনের জিজ্ঞাসার জবাবে ‘ভাল থাকার’ কথাই বললেন। অবশ্য পরবর্তী বাক্যে ছেলের  তিরোধানের কথাও বলে সজল চোখে পাড়লেন। কারখানার শ্রমিক,মাঠের চাষী, নৌকার মাঝি, কামার, কুমার, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, জজ-ব্যরিস্টার, ছাত্র-শিক, অর্থাৎ সকলের কন্ঠে ভাল থাকার কথা শুনা যায়। মন্দ থাকার কথা প্রথমে বলা যেন রীতি বিরুদ্ধ। সকলেই ভাল আছেন যিনি সর্বদা মন্দ থাকেন তিনিও প্রথম মোলাকাতের সময়  প্রথম সম্ভাষণে ‘ভাল থাকেন’। তারপর আস্তে আস্তে শুরু হয় মন্দ থাকার বারমাসী কিসসা কাহিনী। সকল ভাল থাকা লোক উদ্বোধনী বাক্য পর্যন্ত ভাল থাকেন। তারপর ভাল থাকার মুখোশ খসে পড়ে, সকলগোমড় ফাঁস হয়ে যায়।
এত জীবন জ্বালার মধ্যে ভাল থাকার কথা কেন অবলীলাক্রমে বের  হয়ে পড়ে সে কথা ভাবতে ভাবতে একদিন রাস্তা ধরে চলছি। সামনে পড়ে গেলেন এক বন্ধু। একই প্রশ্ন
‘তুমি কেমন আছ’? ‘ভালই আছি’ এই দুটি শব্দ বের হয় হয় অবস্থা -কিন্তু ব্রেক করলাম জবাবই দিলাম না, অন্য কিছু একটা বলে কেটে পড়লাম। প্রকৃত পে আমি কি জবাব দিতে পারি বলুন? যদি বলি ভাল আছি, তাহলে মিথ্যা জবাব হয়। কারণ আমি ভাল নেই? বাত রোগ আর হার্টের রোগে ভূগছি। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। এছাড়াও আছে নানা ঝামেলা, নান ভাবনা, কোনটা দেশী আর কোনটা বিদেশী।
এত সবের পর ভাল থাকি কিভাবে? ‘ভাল আছি’ বললেই তো হলো না, ভালো থাকার পরই ‘ভাল আছি’ ঘোষণা করা চলে। সুতরাং ভাল না থেকে ভাল আছি বলা অনুচিত। মিথ্যা কথা মুখে আসেনি। তাই মিথ্যাবাদী হতে চাইনি। কিন্তু সত্য কথাও বললাম না। ‘আমি ভাল নেই’ এই স্পষ্ট কথা এ জন্যে বলেনি যে, আল্লাহ তাতে নারাজ   হবেন।  অকৃতজ্ঞ হবার ভয়ে সত্য কথাটাও বলিনি। কারণ রোজ কিয়ামতে আল্লাহ যখন বলবেন, তুমি ভাল না মন্দ ছিলে সে ব্যারোমিটারটা তো আমার কাছে, তুমি মন মতলবী স্বার্থপরের মত খেয়ালীকরতে গেলে কেন? ল ল লোকের চেয়ে যে তুমি ভাল আছ তা কি দেখতে পাওনি?
কি যে মুসিবত! সত্য বলাও বিপদ আবার মিথ্যা বলার শাস্তি গুরুতর। সঠিক জবাব দেয়া কঠিন। আমি ভাল আছি না মন্দ আছি তা আমি জানি না । আমার ভাল মন্দ বলার মালিক যেহেতু আমি নই, তাই ভাল মন্দের মাঝামাঝি একটা জবাব দেই। একবার এই মাঝামাঝি  জবাব দিতে গিয়ে এক নাছোড়বান্দা বন্ধুর পাল্লায় পড়েছিলাম। কিভাবে বিপদে পড়েছিলাম তা বলছি।
বন্ধু ঃ কেমন আছ?
আমি ঃ বেঁেচ আছি।
- বেঁেচ যে আছ তা তো দেখতেই পাচ্ছি, তোমার বাঁচা-মরার কথা আমি জিজ্ঞাসা করিনি। আমি জানতে চাচ্ছি তুমি কিভাবে আছ?
- কোন একভাবে বেঁচে আছি।
- কোন ভাবে আর বেঁচে আছ। সেই ভাবটা কি?
- দিন কেটে যাচ্ছে একভাবে।
- যেভাবে যাচ্ছে সে ভাবের ধরণ কি?
- ধরণের ধারণা আমার নেই।
ভাল-মন্দ বুঝার যখন মতা আছে তখন  ‘ধরণের ধারণা’ কেন থাকবে না?
আমার বন্ধুটি এই ভাবে আমাকে নাচিয়ে ছাড়লো। বাধ্য হয়ে অবশেষে আমাকে বলতেই হলো যে, মহা সুখে মহা আনন্দে, মরণের অপোয় আছি। আমার এই কষা উত্তর শুনে বন্ধুটি আবার জের টানলো। এবার আমি মাফ চেয়ে তার মুখ বন্ধ করলাম। 
অন্য এক বন্ধুকে একবার সাধারণ রেওয়াজী জবাব দিয়েও রেহাই পাইনি। ‘ভাল আছি’ জবাব শুনে অবাক হয়ে বলল, তাহলে তুমি সত্যিই ভাল আছ? তুমি যে কত বড় ভাগ্যবান! কেউ যখন এই সংসারে ভাল নেই তখন একা একা তুমি কিভাবে ভাল থাকতে পার- আমাকে একটুখানি খুলে বলনা ভাই। তাকে আমি এই কথা বারবারই বুঝাতে লাগলাম যে, প্রথম কথাতেই তো ‘মন্দ থাকার’ দলিল-দস্তাবেজ  পেশ করা যায় না। প্রথম সাাতে আলাপনে বেদনার ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়, তাতে উভয়েরই মন খারাপ  হয়ে পড়ে। এছাড়া  এতে থাকে স্বার্থপর স্বার্থপর ভাব। এজন্য ভাল আছি বলে প্রশ্নকর্তার মনটাকে খুশি রাখা হয়। কারন আমি যেন ভাল থাকি এটাই তো প্রশ্নকর্তা চান। তিনি যা চান তাই তাকে বলে দেয়া হয়। কিন্তু সর্ব েেত্র এই ফর্মূলা কাজে লাগে না। আমার বন্ধুটিও এই ফর্মূলা মানলো না। বললো সব কথাই বুঝলাম, কিন্তু বন্ধুকে খুশি করার জন্য গোজামিলে ভাল থাকার এই নোংড়া রাজনীতি কেন? ভাবলাম সেও নাছোড়বান্দা। তাই একটুখানি মেজাজ দেখিয়ে বললাম, ‘আমি ভাল আছি’ তাই ভাল বলেছি, শত সমস্যার মধ্যে আমার সন্ত্বনা আছে, সমাধান আছে। আমার এই মেজাজী কথায় সে না মানার ভাব-ভঙ্গিমূলক হাসি হেসে চুপ করলো; কিন্তু চুপ হওয়ার আগে অবশ্য বললো ঃ থাক ভাই থাক, তুমি ভালই থাক। ভাল থাকার ব্যাপারটা একটুখানি জটিল বৈকি। ভাল না থেকেও যে ভাল বলা হচ্ছে তাতেই বাধচ্ছে নানা গন্ডগোল। এ দুনিয়াতে এমন একজন মানুষ পাওয়া যাবে না যার জীবনে কোন সমস্যা বা সংকট নেই। সমস্যা আর সংকটের মধ্যে দিয়ে চলার নামই তো জীবন। কিন্তু সমস্যা আছে বলেই যে সর্বদা প্রকাশ করে বেড়াতে হবে, যার সঙ্গে দেখা হবে তাকে বলতে হবে, ‘আমি ভাল নেই, মন্দ আছি’ এর তো কোন মানে নেই, অর্থ নেই। আমার হাড়িঁর চাল আমাকেই জোগাড় করতে হবে। শূন্য হাড়ি গলায় ঝুলিয়ে দশজনের দৃষ্টি আর্কষণ করা হীনমন্যতা ছাড়া কিছু নয়। আমাকে যা দেয়া হয়েছে হিসাব তারই নেয়া হবে। আমার সমস্যা কিন্তু আমার, সে সমস্যা সাধ্যের সীমানায় সীমিত । সমাধানও সেখানে নিহিত। কোটিপতির বিত্তের প্রতি তাকিয়ে আফসোস করে নিজের কপালে ঠুকর মারার কোন মানে হয় না। কোটিপতির সম্পদের অংশীদারও হবার লোভ যদি থাকে তাহলে কোটিপতির ঝামেলা আর সমস্যার অংশীদারও তো হতে হবে, পারবো কি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সেই বোঝা বহন করতে?
সুতরাং মোটামোটি হিসাবে যেমন আছি তেমনই ভাল আর সেই ভাল যদি সম্পদের না হয়ে চরিত্রের হয় তাহলে আরও ভাল। ভাল আছি না মন্দ আছি তা বলার দরকার নেই। কুশল জিজ্ঞাসার জবাবে যদি আলহামদুলিল্লাহ বলা যায় তাহলে নতুন করে কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না।  আমার ভাল মন্দের মালিক যিনি তার হাওলায় নিজেকে সোপর্দ করে দিলে কোন ঝামেলা পোহাতে হয়না। অবশ্য আলহামদুলিল্লাহ যদি প্রাণহীন রেওয়াজে পরিণত হয়, উচ্চারিত পবিত্র কথায় যদি উচ্চারণকারীর ঈমান আমল না থাকে তা’হলে তা হবে আর এক ধররের মোনাফেকী। তবুও আলতু ফালতু কথা বলার চেয়ে এটা বলা অনেক ভাল। একদিন হয়তো তা ঈমানী আমলে পরিণত হতে পারে।
কোন পথকে অবলম্বন করবেন তা ভেবে চিন্তে দেখবেন, তবে যেমনই থাকুক না কেন ভাল না থাকার ব্যাপারে মিথ্যা মোনাফেকীর আশ্রয় যেন কেউ না নেই। সকল ভাল মন্দ সর্বশক্তিমানের উপর ছেড়ে দিয়ে জবাবটা দিলে নিজের কোন ঝামেলা থাকে না।
এবার সকলের কাছে আমার প্রশ্ন - 
-কেমন আছেন?            ##

জাতীয় সংসদকে উপো করে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘ধর্ম নিরেপতা’ রেখে জাতির সাথে প্রতারণা - হাসান ফেরদৌস




বিশ্বকাপ ক্রিকেট উম্মাদনায় যখন সারাদেশের মানুষ মেতে ওঠেছে। ঠিক সেই সময় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে পরিচিত সংবিধান নিয়ে জাতির সাথে প্রতারণা করেছে সরকার। ষোল কোটি মানুষকে ধোঁকা দিয়ে একটি জাল সংবিধান পুনমুদ্রণ যথেষ্ট সংকীর্ণ ও হঠকারীতার পরিচয় দিয়েছে। আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে নেওয়ার মধ্যে রাজনৈতিক সততা যদি এক আনা থাকে, তাহলে বাকি পনেরো আনাই ছিল অসততা। জাতীয় সংসদকে উপো করে বর্তমান সরকার তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির মাধ্যমে একটি বাকশালী রাষ্ট্র কায়েমের পথে এগোচ্ছে। পুনর্মুদ্রিত সংবিধান নিয়ে আইনমন্ত্রী ও সংবিধান পুনর্মুদ্রণ কমিটির কো-চেয়ারম্যানের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। আইনজ্ঞরা বলছেন, আইন প্রণয়নে এখতিয়ার সম্পূর্ণভাবে জাতীয় সংসদের। এটি সংসদের একচ্ছত্র অধিকার। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আইন প্রণয়ন করবেন। আমাদের সংবিধানে কি থাকবে আর কি থাকবে না তা আইনপ্রণেতাদের ওপরই নির্ধারণের দায়িত্ব রয়েছে। অন্যদের নয়।
গত ১০ ফেব্র“য়ারি আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ স্বারিত পুনর্মুদ্রিত সংবিধান প্রকাশ করা হয়। আইন অনুযায়ি ওই দিন থেকেই পুনর্মুদ্রিত সংবিধানের কার্যকারি শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু এখনও তা কার্যকর হয়নি। তাহলে দেশবাসী কোন সংবিধান মেনে চলবে। রাষ্ট্র কোন সংবিধানের ভিত্তিতে চলছে। তাহলে কি দেশে কোন সংবিধান নেই। নাকি কোন বিশেষ ব্যক্তি ও গোষ্টির জন্য আলাদা আলাদা সংবিধান কার্যকর। সরকারের উচিত দেশের ষোল কোটি মানুষের কাছে তা স্পষ্ট করা। প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন সর্বোচ্চ পবিত্র আমানত নিয়ে সব রকম খামখেয়ালি বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি অভাবনীয় নৈরাজ্যের ঘূর্ণাবর্তে নিপ্তি হতে পারে। নাগরিকরা আইন অমান্যে আসক্ত হতে পারে। পুনর্মুদ্রিত সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত এবং চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়েছে। এতে বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির বিষয়ে প্রধান বিচারপতির যতটুকু মতা ছিল তা অবলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির হাতে সর্বময় মতা ন্যস্ত করা হয়েছে। পুনর্মুদ্রিত সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এখন বিচার কর্মবিভাগে নিযুক্তদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলা বিধানের সব কাজ তদারক করবেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষণার পর ওই রায়ের আলোকে ১৯৭২-এর সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে সংসদীয় বিশেষ কমিটির সদস্যদের কাছে দেয়া হয়। মুদ্রিত কপি এর বাইরে কাউকে সরবরাহ করা হয়নি।
১৯৭২ সালের সংবিধানে উচ্চ আদালতের কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে অভিযোগ উত্থাপিত হলে সংসদীয় অভিশংসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা ছিল। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কারণ দর্শানো সাপেে অপসারণের বিধান প্রবর্তন করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান প্রবর্তন করা হয়। সুপ্রিম সুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ বিষয়টিকে নিজের কৃত অপরাধের বিচার নিজেরা করার শামিল বলে অনেকে মন্তব্য করেন। পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই বিচারকদের অভিশংসনের বিষয়টি সংসদের হাতে ন্যস্ত। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর রায়ে এ ব্যাপারে স্পষ্টত কোনো আলোকপাত করা হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসর-পূর্ববর্তী সব ধরনের লোভ ও মোহের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য বাহাত্তরের সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে অবসর-পরবর্তী প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে নিয়োগের বিধান ছিল না। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসর-পরবর্তী বিচার বিভাগীয় ও আধা বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগের বিধান প্রবর্তন করা হয়। এতে কোনো বিচারক হাইকোর্ট বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করলে তিনি আপিল বিভাগে ওকালতি করতে পারবেন বলে বিধান রাখা হয়। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পদে নিয়োগের বিধান করা হয়। পঞ্চম সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত রায়ে অবসর-পরবর্তী প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে নিয়োগ বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংবিধানের ১১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অধস্তন আদালতগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ‘বিচার কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত থাকিবে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই মতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। ১৯৭৫-পরবর্তী সরকার পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বলা হয়, উপরি উক্ত মতাগুলো রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে। পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ এ বিষয়ে বাহাত্তরের সংবিধানের মূল ধারায় ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়। কিন্তু পুনর্মুদ্রিত সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদে দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শের বিধান রহিত করে অধস্তন আদালত বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ে চতুর্থ সংশোধনী-পরবর্তী অবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিচার বিভাগের যতটুকু স্বাধীনতা বিদ্যমান ছিল চতুর্থ সংশোধনীর এই ধারা বহাল করার মাধ্যমে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু পুনর্মুদ্রিত এই সংবিধান কার্যকারিতা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে সংবিধান পুনর্মুদ্রণের পর এ বিষয়টি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে অনেকে মনে করেন, সংবিধানে কী থাকবে আর থাকবে না তা নির্ধারণের এখতিয়ার সংসদের। আদালত মতামত দিলেও চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার বিষয়টি সংসদেই নির্ধারণ করবে।
বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক জানান, সংবিধানে বেশি হাত দিতে নেই। এতে জনগণের কোনো কল্যাণ হয় না। আইন প্রণয়নে এখতিয়ার সম্পূর্ণভাবে জাতীয় সংসদের। এটি সংসদের একচ্ছত্র অধিকার। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আইন প্রণয়ন করবেন। বিচার বিভাগ একটি অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠান। সংসদ তো আইন প্রণয়নের দায়িত্ব বিচার বিভাগের ওপর হস্তান্তর করেননি। আমাদের সংবিধানে কি থাকবে আর কি থাকবে না তা আইনপ্রণেতাদের ওপরই নির্ধারণের দায়িত্ব রয়েছে। অন্যদের নয়।
সুপ্রিম কোর্টে সাবেক রেজিস্ট্রার ও ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ইকতেদার আহমেদ জানান, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আইন প্রণয়নের েেত্র আইনের খসড়া প্রস্তুত করার পর জনমত যাচাইয়ের জন্য আইন কমিশনের মাধ্যমে সেমিনার ও ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হয়। আইনের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণপূর্বক সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করা হয়। আমাদের দেশে ১৯৯৬ সালে আইন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হলেও এই কমিশন কার্যত অকার্যকর রয়েছে। জনমত যাচাই ছাড়া যেকোনো আইন প্রণয়ন করা হলে সে আইন কখনো জনগণের আশা-আকাঙ্খা পূরণে সম হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল জানান, সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭২ সালে সংবিধান পুনর্মুদ্রণে যে রায় দিয়েছেন এবং সেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কিত যে কথা বলা হয়েছে তা উপো করা হলে সেটি হবে আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন মন্ত্রণালয়ের কাজ এটি হওয়া উচিত নয়। তারা স্বেচ্ছাচারিতা করেছে। আমি এখনো সংবিধানে পুনর্মুদ্রিত কপি হাতে পাইনি। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপরই হস্তপে করা হলে এই পুরো প্রক্রিয়ার জন্য যারা সংবিধান পুনর্মুদ্রণের দায়িত্ব আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর অর্পণ করেছিলেন তারাও যে দায়ী তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

কুহেলি ভেদিয়া জড়তা টুটিয়া এসেছে বসন্তরাজ -অনিমেষ দাস

“হে বসন্ত, হে সুন্দর, ধরনীর ধ্যানভরা ধন, বৎসরের শেষে। শুধু একবার মর্তো মূর্তি ধরো ভুবনমোহন নব বরবেশে!” ধনধান্যে পুষ্পে ভরা  এ বসুন্ধরার রূপবৈচিত্র পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। বাংলার প্রকৃতির রূপ, রস গন্ধ অবিরত রং বদলায় । ঋতুবৈচিত্র্যে বাংলার প্রকৃতি সাজে নানান সাজে। অফুরন্ত এরূপ সর্বদা নব নব সাজে সজ্জিত হয়। সুজলা -সুফলা, শস্য-শ্যামলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ বৈচিত্রময় দেশ কখনো ভৈরবী রূপ নেয়, কখনো বিুদ্ধ হয়ে ওঠে, কখনো সজল কালো চোখ তুলে ভালোবাসার বান ছুঁড়ে দেয় প্রকৃতির সন্তানদের দিকে। কখনো কিশোরী মেয়েদের মতো বাঁকা চায় , কখনো যৌবন রসে সিক্ত করে  সবাইকে। জীবনানন্দের রূপসী বাংলার অফুরন্ত রূপ কখনো ফুরিয়ে যায় না। ষড়ঋতুর বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে অন্যতম বৈচিত্রময় দেশ। অফুরন্ত এ রূপ নব নব সাজে সজ্জিত হয়। ছয়টি ঋতু পর্যায়ক্রমে  আসে। শীতের বুড়ির  কুয়াশার ঘোমটা খুলে প্রকৃতিতে হাজারো ফুলে রং ধরিয়ে দিতে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। ঋতুরাজের আগমনে মৃদুমন্দ দনিা বাতাসের যাদুস্পর্শে  বর্ণবিরল  পৃথিবীর সর্বাঙ্গে লাগে অপূর্ব পুলক প্রবাহ, বনবীথিরন রিক্ত শাখায় জাগে কচি কিশলয়ের অফুরন্ত উল্লাস। বাতাসের মৃদু মর্মর ধ্বনি এবং  দূর বনান্তরাল থেকে ভেসে আসা কোকিলের কুহুগীতি পৃথিবীকে সৃষ্টি করে এক অপরূপ মায়া নিকেতন। অশোক পলাশের রঙিন বিহবলতায় ও শিমুল কৃষ্ণচূড়ায় বিপুল উল্লাসে, মধুমালতী ও মাধবী মঞ্জুরীর উচ্ছল গন্ধমদির প্রবল তায় সারা আকাশ তলে গন্ধ, বর্ণ ও গানের তুমুল কোলাহলে লেগে যায় এক আশ্চর্য মাতামাতি। কবির ভাষায়-
কুহেলি ভেদিয়া
জড়তা টুটিয়া
এসেছে বসন্তরাজ।
নবীন আলোকে
নবীন পুলকে
সাজিয়েছে ধরণী আজ।”
শীতে প্রকৃতি রিক্ত হয়। শীত যেন বসন্তের পটভূমি তৈরি করে। নবপত্র সম্ভারে, বর্ণগন্ধময় পুষ্পের সমারোহ, পূর্ণ চাঁদের  মায়ায় আসে ঋতুরাজ বসন্ত। শীত ও গ্রীষ্মের এই সন্ধিকালটি  পরম রমনীয়। ফাল্গুনের আগমনে নবপল্লবে  সুশোভিত হয় গাছপালা, বিচিত্র বর্ণ ও গন্ধের পুষ্পে  সুশোভিত হয়ে ওঠে  পৃথিবী। গন্ধ ও বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয় কোকিলের কুহুধ্বনি এবং অন্যান্য গায়কী পাখির কন্ঠ। এ যে প্রকৃতির নব যৌবনের প্রতিমূর্তি। ঋতুরাজের যাদুময়ী স্পর্শে  গাছপালা তৃনলতায় নতুন নতুন পাতায় সুশোভিত হয়ে ওঠে । আকাশে বাতাসে গোলাপ কিংশুকে আনন্দের শিহরন বয়ে যায়। পৃথিবীতে যেন স্বর্গের সৌন্দর্য নেমে আসে। মানুষের মনে আনন্দ ধরে না। শীতকালে কনকনে শীত সহ্য করতে না পেরে যে মধুকন্ঠ  কোকিল লুকিয়ে থাকে তারা আবার ফিরে আসে বসন্তের সময় । পাতার  আড়াল  থেকে শোনা যায় তাদের সুমধুর গান। বসন্তকালে আম, জাম, লিচু প্রভৃতি গাছে মুকুল ধরে। মুকুলের গন্ধে মৌমাছি ব্যাকুল  হয়ে ছুটে আসে। এদের  গুঞ্জনে চারদিক মুখোরিত হয়ে ওঠে। প্রজাপতি তার রঙিন ডানা মেলে উড়তে থাকে। তখন মৃদুমন্দ দনিা বাতাস বয়ে যায়। সকলের অঙ্গে বুলিয়ে  দেয় শান্তির পরশ। প্রকৃতির সারা অঙ্গে যৌবনের ঢেউ খেলে যায় এবং মাটির পৃথিবী নতুন আনন্দে  হাসতে থাকে। দিনে সূর্যের  আলো এবং রাতে চাঁদের স্নিন্ধ  কিরণ পৃথিবীর বুক থেকে শীতের কালিমা দূর করে দেয়।  তখন বনে বনে ফোটে  শিমুল ,কৃষ্ণচূড়া, অশোক, পলাশ, প্রভৃতি ফুল। তাদের উজ্জল  লাল রং সকলের  হৃদয়  রাজ্যে রঙের পরশ বুলিয়ে দেয়। তাইতো কবি মাইকেল মধুসূধন দত্তের কন্ঠে বসন্তের সৌন্দর্য বর্ণনা শুনি এভাবে
ফুটিল বকুল ফুল কেন লো গোকুলে আজি
কহ না সজলি?
আইল কি ঋতুরাজ? ধরিলা কি ফুলসাজ
বিলাসে ধরণী?
শহুরে জীবনটা প্রকৃতির খুব কাছাকাছি না থাকায়  প্রকৃতির রং ধরার গল্পটা হয়তো শহুরেদের মনে দোলা দেয় না। কিন্তু ই্ট -কাঠ-পাথরের এ-নগর জীবনের একটি ঋতুর জন্য আমরা রাঙিয়ে নেই নিজেকে ফাল্গুনের রংয়ে। বসন্তকে বরণ করে নিতে এই যে উৎসব পহেলা ফাল্গুন  আমাদের উৎসাহিত করে। কারণ এর মধ্যে দিয়েই আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মকে দিয়ে যাই তার শেকড়ের সন্ধান। ফাল্গুনেই ধরা পড়ে এই বাংলার বিস্ময়কর সব সৌন্দর্য। কবির ভাষায়,
“ও আমার বাংলা মা তোর
আকুল করা রূপের শোভায়
হৃদয় আমার  যায় জুড়িয়ে।
ফাগুনে তোর কৃষ্ণচূড়ায় পলাশ   
 বনে কিসের হাসি, চৈতি রাতে
উদাস সুরে রাখাল বাজায় বাঁশের বাঁশি।”
সত্যি বসন্ত অন্য সব ঋতুকে যেন হার মানায়। সেই সঙ্গে সোনাভরা রোদের ঝিলিক যদি আছড়ে পড়ে, তাহলে তো কথাই নেই। এ ঋতুর রূপময় বৈচিত্র মনের আকাশও যেন  রঙিন হয়ে ওঠে। বসন্ত ঋতুকে আরও বর্ণিল করে তোলে বাঙালির বিভিন্ন উৎসব পালন। চারদিক যেন উৎসবে মুখরিত হয়ে থাকে, আর এ উৎসবে প্রাণের আবেগে ছুটে চলে সবাই। পহেলা ফাল্গুন নিয়ে বাঙালির উৎসাহ উদ্দীপনার কোন কমতি নেই। বারো মাসে তেরো পার্বন-কথাটির যথার্থতা রাখতেই বুঝি পহেলা ফাল্গুন উৎসবের আবির্ভাব। কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে এই ছোট  খাটো উপলদ্ধিগুলোই এনে দেয় ভিন্ন মাত্রা। প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পাওয়া যায় নির্মল আনন্দ। আর এ আনন্দ যদি সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তবে জীবনের সৌন্দর্য  সবার চোখে ধরা দেবে। ঋতুরাজ বসন্তের অনুভূতি সম্পর্কে কবি আসাদ চৌধূরী বলেন- “বসন্ত আমার প্রিয় ঋতু। বসন্তের প্রথম দিনে তরুন-তরুনীরা সহ সব বয়সের মানুষ সুন্দর করে সাজে, যা দেখতে ভালো লাগে। বসন্ত বরণ অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ি, গায়ে থাকে পাঞ্জাবি ও চাদর।”  বসন্তের শীত ও গ্রীষ্মের বিপরীতমুখী আচরণ এক জায়গায় এসে থমকে দাড়াঁয়। তখন থাকে না শীতের হাড়ভাঙা কাঁপুনি আর গ্রীষ্মের মাথা ফাটা উত্তাপ । তাই তখন মনে আসে নতুন উদ্যম আর দেহে  আসে নতুন শক্তি  এবং সামর্থ। সকলেই শীতের জড়তা কাটিয়ে সতেজ প্রাণ, নতুন উদ্দীপনা নিয়ে  কাজে লেগে যায়। বসন্তের সৌন্দর্যে  সারা দেশকে  আন্দোলিত  করছে । গ্রামের এই সীমাহীন  মাঠ, পথ , ঘাট সর্বত্রই হাওয়ায় কম্পমান । বসন্তে ফিরে আসে  প্রতিটি প্রানীর মনে সতেজ অনুভূতি, সতেজ জীবন। শুধু গ্রামে নয় , বি বিধন আর ফ্যাট, কালচারে নি®প্রান প্রায় এই কংক্রিটের জঙ্গল রাজধানীতেও এখন যেটুকু সামান্য সবুজ আছে সেখানে গেলে চোখ জুড়িয়ে যাবে। বোটানিক্যাল গার্ডেন , রমনা পার্ক, বনানী লেক, ধানমণ্ডি লেক, সোহরাওযাদীউদ্যান, মিন্টু রোড, বলধা গার্ডেন, চারুকলার পেছনের সবুজ প্রাঙ্গন ফুলে ফুলে উচ্ছল -উজ্জল এখন  বাসন্তী হাওয়ায়। এসব এলাকায় কোকিলের কুহুস্বরে মুখর পরিবেশ মন যেন কোন  উ দাস লোকে  হারিয়ে যেতে  চায়। মৃদুমন্দ  বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে বসন্ত জানিয়ে  দিয়ে যায় সত্যি সত্যি সে ঋতুর রাজা। বসন্তের বানী নতুন কে বরণ করার পুরাতনকে  বর্জন করার, ফাল্গুন  ও চৈত্র এ দুটি মাস অতি মধুর রূপে সেই বানীকে  বসন্তের বীনায় ঝংকৃত করে তোলে।
বসন্তকালে গাছে গাছে নানা রঙের ফুল ফোটে। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় প্রকৃতি । সৌরভে  আসে অলি, ভ্রমরের গুঞ্জনে  মুখরিত কৃঞ্জবন। প্রকৃতির রূপের নেশায় মানুষ  মাতাল হয়ে ওঠে। তাই বসন্তকে ঋতুরাজ বলা হয়ে থাকে। কবির ভাষায়
“আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে
এত বাঁশি বাজে
এত পাখি গায়।”
ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে উঠেছে বাংলার সবুজ প্রকৃতির অঙ্গন। রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গানের আকুতি যেন ছড়িয়ে পড়েছে চরাচরে
“ফাগুনে হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান
আমার আপন হারায় প্রান
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান
তোমার অশোকে কিংশুকে
অল্েয রঙ লাগল আমার অকারনের সুখে।”
সত্যি সত্যি অকারনে সুখের হাওয়ায় দুলিয়ে দেয় বাঙালির হৃদয় । বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আধুনিক কালের  বাউল  কবির হৃদয় পর্যন্ত বার বার দুলিতেছে ঋতুরাজ বসন্তে। সে জন্যই বসন্ত বাতাসে বন্ধুর বাড়ির ফুলের সুবাসে মন আনচান করে বাউল কবিরও। সেই মন কেমন করা অনুভবে বাংলার ঋতুরাজের আগমনী  দিনে আজ আনন্দের হাট বসেছে  রাজধানীসহ সারাদেশের  সচেতন অগ্রসর তরুন -তরুনীদের মনে।  তাদের যেন কোথাও  আর হারিয়ে  যেতে নেই মানা। তরুন-তরুনীদের মনে  মনে গুঞ্জরিত হবে ভালোলাগার গান, ভালোবাসার গান। তাঁদের হৃদয়ে  যেন বাজিতেছে সুরের ধ্বনি।
এই মধুর বসন্ত ঋতুতে ও মানুষ নানা রকম রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। কলেরা বসন্ত, টাইফয়েড, প্রভৃতি মারাতœক ব্যাধি আনন্দের মাঝে নিরানন্দের  ছায়া পাত করে। তবুও বসন্তের যে বাড়তি সৌন্দর্য ভূলে যাওয়া চলবে না। এখন দনিা মলয় এসে উড়িয়ে নিয়ে যায় শাড়ির আঁচল তখনি  মনে পড়ে সেই শৈশবের কিছু কিছু গান। যা কখনো ভুলবার নয়। তাই যেন মনে পড়ে যায়
“দনিা মলয় ঢেউখেলে যায়-
মনের বাতায়নে’/ শৈশবের কত স্মৃতি
পড়ে যায় মনে।”
শুধু তাই নয়। শীত ও গ্রীষ্মের মাঝখানে অবস্থিত  বসন্তকাল মানুষের পে খুবই আরামপ্রদ। প্রানের আরামের সঙ্গে দেহের আরামের অবকাশও এই  ঋতুতে তৈরী  হয়। নানাবিধ রবি শস্য এবং নানাবিধ রসালো ফলের উপহার দেয় বসন্ত। আর থাকে মলয় বায়ু ফুলের সৌরভ ও কোকিলের কুহুতানে মন জুড়ানো আনন্দ। যখন শাখে শাখে পুষ্প ফোটে, দনিা মলয় ঢেউ খায় পাতায় পাতায়। কোকিলের  কুহুকুহু তানে মুখরিত হয়ে উঠে কানন, তখনই সেই প্রিয়জনের কথা মনে পড়ে যায়। যখনই মহাসমারোহে বসন্ত তার অপরূপ পরসার ডালি সাজিয়ে প্রকৃতির দ্বারে উপস্থিত হয়, প্রকৃতির পরতে পরতে সৌন্দর্য ঢেউ প্রবাহিত হয়, বাতাবি লেবুর গন্ধে চারদিক সুশোভিত । আমের মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে সুবাসিত তখনই সেই প্রিয়জনের কথা মনে পড়ে যায়।
কবি সুফিয়া কামালের ভাষায় -
“কুহেলি উত্তরী তালে মাঘের সন্নাসী
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূণ্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে। তাহারেই পড়ে মনে , ভুলিতে পারি না কোন মতে।”
আবার না পাওয়ার বেদনাও কিন্তু কম নয়। যাইহোক, বসন্ত আসার সাথে সাথে স্রোতস্বিনীর মর্হোমি ছন্দের তালে তালে রুনু ঝুনু রুনু ঝুনু  করে বাজতে থাকে। মন চায় নদীর পাড়ে গিয়ে আনমনা হয়ে বসে, বিশুদ্ধ দনিা মলয় গ্রহন  করতে। মন চায় সতেজ  অনুভূতির নি:শ্বাস ত্যাগ করতে। নদীর সাথে সারাটি ণ বসে মিতালী  গড়ে তুলতে  ইচ্ছে করে। মনের যত অজানা কথা আছে তা নীরবে নদীর সাথে বলতে ইচ্ছে করে। কবির ভাষায়-
“সারাটি ণ নদীর সনে
বলব কথা যত মনে
কূল কূল নদীর বানে
প্রাণ জুড়াব ঢেউয়ের তানে।”
শীতের ত্যাগের সাধনা বসন্তে সার্থক হয়ে ওঠে । প্রকৃতির সারা অঙ্গে নতুন প্রাণ। নতুন উৎসাহ বসন্ত হয়েছে ঋতুরাজ।  বসন্ত মানুষের প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি। বসন্ত যে সুন্দর , আর সুন্দর মুখের জয়ই তো সর্বত্র বসন্ত যৌবনের ঋতু, সুন্দরের ঋতু আনন্দের ঋতু। তাই সে ঋতুরাজ। তাই তো
ফুলে ফুলে ভ্রমরের গুঞ্জনে,
কুহু কুহু কোকিলেরন তানে
মুখরিত ধরনী মন নাহি মানে।
মুষমামন্ডিত  স্বর্গের কাল্পনিক সুখের চেয়ে
 আনন্দ সুখ বিরাজমান
অনুভূত এখানে।
যুগ যুগ ধরে সুন্দরের পূজারিরা সৌন্দর্যের পূজা  করে গেছেন। তাই বাঙালি এবং বাঙালিদের আচার আকৃতি -প্রকৃতি  প্রভৃতি  বলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেত হয়। বসন্তের সৌন্দর্যের মতে প্রতিটি মানুষের জীবন আনন্দ উল্লাসে ভরে উঠুক সেই আশাই কামনা করি।
লেখক : শিার্থী
গলাচিপা ডিগ্রি কলেজ
গলাচিপা , পটুয়াখালী।

বিােভে উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য : অশনিসংকেত মুসলিম বিশ্বের জন্য সম্রাট নূর

মধ্যপ্রাচ্যের এখনই সর্তক না হলে অশনি সংকেত দেখা দেবে গোটা মুসলিম দেশগুলোতে। এমনই মন্তব্য করেছেন বিষেশজ্ঞরা। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন দিন দিন প্রবল আকার ধারণ করছে। তিউনিসিয়া ও মিশরের পর এবার বাহরাইন, লিবিয়া এবং ইয়েমেনের বিােভকারীরা মতাসীনদের বিরুদ্ধে রাজপথে বিােভ অব্যাহত রেখেছে। সরকার বিরোধীদের বিােভে উত্তাল মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বাহরাইনে বিােভকারীরা সরকার পতনের ডাক দিয়েছে। তারা বলেছে সরকার গদি না ছাড়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাবে না। অপরদিকে, লিবিয়াতে বিােভ সহিংসতায় কয়েকশ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে বলে জানা গেছে। লিবিয়ায় সেনাবাহিনী বিােভকারীদের ওপর ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। বাহরাইনে সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিলেও দাবি না মানলে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিরোধী দলগুলো। মরক্কোর রাজধানীতেও বিােভ হচ্ছে। মিসরের সেই তাহরির স্কয়ারে আবার জমায়েত হচ্ছে বিােভকারীরা। তিউনিসিয়ায়ও বিােভ থামেনি। মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বের বিপ্লবে     
উদ্বুদ্ধ হয়ে এবার চীনেও আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়েছে। তিউনিসিয়া ও মিসরে সফল গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতন হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিরাট অংশে লেগেছে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ। লিবিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেন বিােভে উত্তাল হয়ে উঠেছে। অপরদিকে, মিসরে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোকবারকের পতনে বিজয় উল্লাসে মেতেছে জনতা। অন্যদিকে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিউনিসিয়ার পলাতক প্রেসিডেন্ট বেন আলী কোমায় চলে গেছেন। সৌদি আরবের একটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। এদিকে লিবিয়া সরকার বিােভে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতা বন্ধ না করলে তাদেরকে চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুমকি দিয়েছে ওবামা প্রশাসন। লিবিয়া অশান্ত হবার কারণে তেলের দামও বেড়ে গেছে।

দেশে দেশে বিাোভ-সমাবেশ
লিবিয়ায় আন্দোলন : লিবিয়ার নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি পদত্যাগ না করে প্রয়োজনে শহীদ হবেন বলে ঘোষণা দেয়ার পর দেশটি মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। গাদ্দাফির এক সাক্ষাতে টিভি ভাষণে তার বাহিনীকে বিােভকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এরপর বিােভকারীদের সাথে সরকারের অনুগত বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। একে গৃহযুদ্ধের আলামত হিসেবে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং জাতিসংঘ। তবে গাদ্দাফি মতা ছাড়বেন না বলে ঘোষণা দিলেও তার পৃথিবী ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। একের পর এক শহরের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে বিােভকারীদের দখলে। বিশ্বের বহু দেশ এবং জাতিসংঘ সেখানকার হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়েছে। এতে আরো কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন তিনি।
বিােভ দমনে গাদ্দাফি চরমপন্থা অবলম্বনের পরেও রাজধানী ত্রিপোলির দখল নেয়ার জন্য বিােভকারীরা জোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সূত্র জানায়, গাদ্দাফির নড়াচড়া এখন কার্যত রাজধানী ত্রিপোলিকেন্দ্রীক হয়ে পড়েছে। বিােভকারীরা দাবি করে, গাদ্দাফিকে পদত্যাগ করতেই হবে। তবে বিােভকারীদের উপর নিজ সমর্থকদের হামলা চালানোর আদেশ দিয়ে পালানোর পথ তিনি নিজেই বন্ধ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করে প্রয়োজনে শহীদের মৃত্যু বরণ করবেন। নিজ সমর্থকদের ঘর থেকে বের হয়ে বিােভকারীদের মোকাবিলা করার আহ্বান জানিয়েছেন গাদ্দাফি। তার দমনাভিযানের হুমকি উপো করে হাজারে হাজারে রাজপথে নামছে আন্দোলকারীরা। এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব। গাদ্দাফি মতা থেকে সরে না দাঁড়ানোর কথা জানিয়ে বিােভ দমনের হুমকি দেওয়ার পর আন্দোলন গতি পেয়েছে। একের পর এক শীর্ষ কর্মকর্তা গাদ্দাফির প ত্যাগ করছেন। আন্তর্জাতিক চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন গাদ্দাফি। বেনগাজিতে উৎসব শুরু করেছে বিােভকারীরা। একদিকে বিােভের জোয়ার আর অন্যদিকে গাদ্দাফির দমনাভিযানের হুমকিতে বড় ধরনের সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কায় লিবিয়ায় নিজ নিজ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
পদত্যাগ করবেন না ঃ এক টেলিভিশন ভাষণে গাদ্দাফি বলেন, শহীদ হব, তবু পদত্যাগ করবো না। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কিছু তেল কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কারণে তার বিরুদ্ধে বিােভ হচ্ছে। ভাষণের সময় গাদ্দাফি ােভে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বার বার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে টেবিলে আঘাত করতে থাকেন। লিবীয় নেতা বলেন, আমি একজন যোদ্ধা। তৃণমূল থেকে আমি বিদ্রোহী গাদ্দাফি হয়েছি। বিােভকারীদের হুশিয়ার করে তিনি বলেন, আমি এখনো আমার সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তি প্রয়োগ করার আদেশ দেইনি। এখনো গুলি চালানোর নির্দেশ দেইনি। যখন সেই আদেশ দিব, তখন কিন্তু সব জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ওহে নারী-পুরুষ তোমরা যারা গাদ্দাফিকে ভালোবাস, সবাই ঘর থেকে বের হয়ে রাজপথ দখলে নাও। ঘর ছেড়ে তাদের আক্রমণ কর। তোমরা বের হয়ে তাদের উপর হামলা চালাও। গাদ্দাফি তরুণদের নিজ নিজ এলাকায় কমিটি গঠন করতে আহ্বান জানান। তার সমর্থকরা যাতে একে অন্যকে চিনতে পারে সেজন্য তিনি হাতে সবুজ ব্যান্ড পরতে বলেন। তিনি নিজেকে যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, লিবিয়া গৌরব চায়, লিবিয়া গোটা বিশ্বের শীর্ষে উঠতে চায়। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ুন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই ভাষণের মাধ্যমে গাদ্দাফি গৃহযুদ্ধকে উসকে দিলেন।
প্রত্যদর্শীদের বিবরণ ঃ ত্রিপোলির বাসিন্দারা জানান, গাদ্দাফির বাহিনী গণহত্যা শুরু করেছে এবং বন্দুকধারীরা নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করছে। তারা জানান, পার্শ্ববর্তী এলাকার সশস্ত্র আফ্রিকান ভাড়াটে সৈন্য ভর্তি একটি বিমান অবতরণ করেছে। ভাড়াটে সৈন্যরা রাস্তায় যাকে দেখছে তার ওপর গুলি চালাচ্ছে। এতে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটেছে।
প ছাড়ছেন কূটনীতিকরা ঃ বিােভকারীদের ওপর সহিংস দমনাভিযানের প্রতিবাদে গাদ্দাফির সরকারের প ত্যাগ করছেন জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত লিবিয়ার শীর্ষ কূটনীতিকরা। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, আরব লীগ, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত এবং বাংলাদেশের দূতবাসের লিবীয় কূটনীতিকরা হয় পদত্যাগ করেছেন নয়তো গাদ্দাফি সরকারের প ত্যাগ করেছেন। এদিকে তুমুল গণবিােভে লিবীয় নেতা গাদ্দাফির গদির অবস্থা নড়বড়ে হয়ে গেছে। বিােভকারীরা দেশের অন্যতম প্রধান শহর বেনগাজি দখল করার পর রাজধানী ত্রিপোলিতে ব্যাপক বিােভ শুরু করেছে। ুব্ধ আন্দোলনকারীরা পার্লামেন্টের একটি ভবন, একাধিক মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় টিভি ভবনে আগুণ ধরিয়ে দেয়। আগুনে পুড়িয়ে দেয় রাজপথের বহু সংখ্যক গাড়ি। বিােভকারীরা ব্যাংক এবং সরকারি ভবনের বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুট করেছে। রাজধানীসহ একাধিক শহরে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। লিবিয়ায় চলমান বিােভ-সহিংসতার মধ্যে মতা আঁকড়ে ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন গাদ্দাফি ও তার পরিবার। গাদ্দাফি পুত্র ইতিমধ্যে দেশের গৃহযুদ্ধ হতে পারে বলে হুমকি দিয়েছেন। তিনি বিােভকারীদের আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বিােভকারীরা তাদের প্রস্তাবে কর্ণপাত করছে না। তাদের একমাত্র দাবি এখন গাদ্দাফির পদত্যাগ। লিবিয়া সরকারের বিােভ দমনাভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেন। এর বিরুদ্ধে সমুচিত ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে তারা। ফলে বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে গাদ্দাফি প্রশাসন। ব্যাপক হতাহতের পর লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলী ছাড়তে সাংবাদিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ডাক্তাররা দেশের এ ঘটনাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছেন। তারা জানান, হাসপাতালে শুধু আহত রোগী আর রোগী। আহতদের প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ডাক্তাররা চিকিৎসা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, লিবিয়ার ৪২ বছরের শাসক কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির পদত্যাগ ও দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে বিােভ করছে জনতা। ১৯৬৯ সালে তরুণ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লিবিয়ার রাষ্ট্রমতা দখল করেন গাদ্দাফি। তখন থেকে দেশটি শাসন করে আসছেন তিনি। গাদ্দাফি হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের কোনো দেশের শাসকদের অন্যতম এবং লিবিয়ার সবচেয়ে বেশি সময়ের শাসক। বিােভ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দেশটিতে ইতিমধ্যেই বন্ধ করা হয়েছে ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও আল-জাজিরা ওয়েবসাইট।
রাষ্ট্রদূতের পদত্যাগ ঃ এদিকে, বিােভকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ও মুয়াম্মার গাদ্দাফির পদত্যাগের দাবিতে ভারতে নিযুক্ত লিবিয়ার রাষ্ট্রদূত আলি আল-এসাবি পদত্যাগ করেছেন।
ইয়েমেন গণ আন্দোলন ঃ মধ্যপ্রাচ্যের আন্দোলনের ঢেউয়ের আঘাত চলছে ইয়েমেনেও। ইয়েমেনে প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল সালেহর পদত্যাগের দাবিতে বিােভ শুরু হয়েছ। দেশটিতে সরকারবিরোধী বিােভ-সহিংসতায় নিহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। তাইজে শহরের হুরিয়া (স্বাধীনতা) স্কয়ারে সমবেত বিােভকারীদের উপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হামলায় বেশ কয়েকজন বিােভকারী আহত হয়েছে। শহরে শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিােভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ার গ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রেণর চেষ্টা করছে।
মিশরে বিজয় মিছিল ঃ মিসরের সফল গণ অভ্যুত্থান উদযাপন করতে বিজয় মিছিলের আয়োজন করে জনগণ। হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের শাসনাবসান উপলে এ মিছিলে যোগ দেয় হাজার হাজার মানুষ। আন্দোলনের ১৮ দিনের নিহত শতাধিক মানুষকে তারা স্মরণ করে এ বিজয় যাত্রার মধ্য দিয়ে। এ বিজয়কে ব্যর্থ হতে দেয়া হবে না। বিােভকারীদের প্রতি কঠোর হবে মিসরীয় সেনাবাহিনী মিসরে গণআন্দোলনের পর প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতন হবার পর এখনও একটি অংশ বিােভ বন্ধ না করায় কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছে সেনাবাহিনী। বিােভকারীদের প্রতি সেনাবাহিনী ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। মিলিটারি কাউন্সিলের প থেকে বলা হয়েছে আর কোনো ধরনের বিােভ কিংবা ধর্মঘট সহ্য করা হবে না। কঠোর হস্তে এসব দমন করা হবে।
তিউনিসিয়া মতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মৃত্যুর মুখে : এদিকে, তিউনিশিয়ার মতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট জাইন আল আবিদিন বেন আলী স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে সৌদি আরবের এক হাসপাতালে কোমায় রয়েছেন। তার পারিবারিক এক বন্ধু এ কথা জানান। সূত্র মতে, স্ট্রোক করার পর তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তিনি কোমায় চলে যান। তার অবস্থা আশংকাজনক।
চীনেও আন্দোলনের ডাক : আরব বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে চীনেও আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের জন্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে গণজমায়েতের ডাক দেয়া হয়। সাংহাই, বেইজিংসহ বড় বড় শহরে এই জমায়েতের আয়োজন করা হয়। তবে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং কয়েকজন মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করে।
বাহরাইনে বিােভ : বাহরাইনে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করতে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। রাজধানী মানামার নিয়ন্ত্রণ এখন সশস্ত্র বাহিনীর হাতে। সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সরকার সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করলেও হাজার হাজার বিােভকারী মানুষের ঢল নামে। হাজার হাজার মানুষ এসে জড়ো হয় রাজধানীতে। তারা সরকারবিরোধী ব্যানার নিয়ে রাস্তায় শ্লোগান দেয়।
ব্যাপক রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে কয়েকদিন যাবৎ বাহরাইনে বিােভ চলছে।
কয়েকদিনের বিােভের পর সম্প্রতি বাহরাইন সরকার দেশটিতে বিােভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সেনাবাহিনী রাজধানী মানামার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং রাজধানীতে প্রবেশের পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক নিয়ে টহল দেয়া শুরু করে। আকাশে হেলিকপ্টার দেখা যায়। কোথাও কোথাও দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে বিােভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ  হতে দেখা যায়। খবর বিবিসি, রয়টার্স, এপি, এএফপি, সিএনএন।
বিরোধী দলের রাজনীতিবিদ ও বিােভকারীরা এই দমন-পীড়নকে নিষ্ঠুর কাজ বলে অভিহিত করেছেন। সংখ্যালঘু শিয়াদের প্রধান দলের এক নেতা বলেছেন, সরকারের কর্মকান্ডের প্রতিবাদে ১৮ জন এমপি পদত্যাগ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সবকিছুই আমরা করব, প্রয়োজনে জীবন দিয়ে দিব। আমরা কার্যকর ও সাংবিধানিক গণতন্ত্র চাই।
নিরাপত্তা পরিষদের নিন্দা ঃ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ লিবিয়ায় সরকার বিরোধী বিােভকারীদের ওপর প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফির অনুগত বাহিনীর ভয়াবহ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। পাশাপাশি তারা লিবিয়ায় দ্রুত সহিংসতা বন্ধেরও দাবি করেছে। পনের সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ হামলার ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহবানও জানিয়েছে। পরিষদ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও শক্তি প্রয়োগ এবং শান্তিপূর্ণ বিােভকারীদের ওপর দমন পীড়ন বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন ঃ এদিকে লিবিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে পেরু। লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে মতাচ্যুত করতে স্বতস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রক্তয়ী অভিযানের প্রোপটে পেরুই প্রথম দেশ হিসেবে এ ধরনের পদপে নিল। পেরুর প্রেসিডেন্ট অ্যালান গার্সিয়া বলেছেন, জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত লিবিয়ার সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করছে পেরু।
বারাক ওবামার নিন্দা ঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিােভকারীদের প্রতি সংযত আচরণ করার জন্য সব দেশের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। বিশেষ করে বাহরাইনের বাদশাহকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে জোরালো সহযোগিতার প্রস্তাব করা ইয়েমেন ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শত্রুভাবাপন্ন দেশ লিবিয়ায় সরকার বিরোধী বিােভকারীদের ওপর দমনপীড়নেরও নিন্দা জানান। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা সমর্থক এ দেশে স্থিতিশীলতা দেখতে চায়। তিনি তিউনিসিয়া, মিশর, বাহরাইন, লিবিয়া ও ইয়েমেনসহ যে সব দেশে গণ আন্দোলন শুরু হয়েছে এতে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছেন।
মরক্কোর  রাজধানী রাবাতেও হাজার হাজার লোক বিােভ করে। বাদশার কিছু মতা হ্রাসের দাবিতে তারা বিােভ করছে। এদিকে তিউনিসিয়ার রাজধানীতে বিােভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা গুলি করে নিরাপত্তা বাহিনী। তারা অন্তর্বতী সরকারের পরিবর্তন চায়। ব্যাপক বিােভের মুখে তিউনিসিয়ায়ই প্রথম সরকার পতন হয়। তবে বাহরাইন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংগঠন গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল সংগঠিত এ সমস্যা সমাধানে বিশেষ বৈঠক আহ্বান করেছেন।
- সাংবাদিক

ভোক্তাদের অধিকার রায় আইনের যথার্থ প্রয়োগ চাই মো: আশরাফ আলী



বর্তমানে আমাদের দেশে দ্রব্যমুল্যের উর্ধ্বগতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দড়িয়েছে। দ্রব্য মুল্যবৃদ্ধিও নামে চলছে এক ধরনের প্রতারনার খেলা, কোন ধরনের নিয়ম নীতিকে তোয়াক্কা না করে যে,যার মত মূল্য আদায় করে নিচ্ছে ভোক্তাদের কাছ থেকে। এর ফলে তিগ্রস্থ হচ্ছে সর্বস্থরের মানুষ,তবে তুলুনামুলক বেশি র্দুভোগের শিকার হচ্ছে দিনমুজুর,কৃষক ও নিম্নবৃত্ত সীমিত আয়ের মানুষ। এেেত্র কৃষকরা তিগ্রস্থ হচ্ছে উভয় দিক থেকে, কারন তাদের কোন উৎপাদিত পন্য বিক্রি করার সময় কমদামে বিক্রি করতে হয় এবং ওজনেও তাদের কাছ থেকে নেয়া হয় ৪২ কেজিতে মণ হিসাবে। আবার তারা যখন কিনতে যায় তখন তাদের পর্ন কিনতে হয় চড়া দামে। এই প্রতারিত বা তিগ্রস্ত ভোক্তদের সার্থ রার ল্েয চার দলিয় জোট সরকার আমলে আইন করার উদ্যোগ নেয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আইনটির কাজ এগিয়ে নিলেও বর্তমান সরকারের আমলে জাতীয় সংসদের সর্বচ্চো ফোরামে ৬-ই এপ্রিল ২০০৯ ইং তারিখে আইনটি পাস হয়। যার নাম দেয়া হয় ভোক্তা অধিকার সংরন আইন-২০০৯। কিন্তু আইনটি পাস হওয়ার পর যথার্থ প্রয়োগ না হওয়ায় ভোক্তারা এখনও এর সুফল পায়নি। 
আইনটিতে ভোক্তাদের অধিকার বিরোধী কার্যহিসাবে যে সব দিক চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলোর কয়েকটি নিম্নে দেয়া হলোঃ
এই আইনের ২০(ক) কোন আইন বা বিধির অধীন নিধারিত মুল্য অপো অধিক মুল্যে কোন পন্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় করা বা প্রস্তাব করা;
   (খ) অজ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পন্য বা ঔষুধ বিক্রয় বা করিতে  প্রস্তাব করা;
  (গ) মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ভাবে তিকারক কোন দ্রব্য, কোন খাদ্যপন্যের সহিত যা মিশ্রন কোন আইন বা বিধির  অধীন নিষিদ্ধ করা হয়েছে উক্ত রূপ দ্রব্যমিশ্রিত  কোন পন্য বিক্রায় বা  করিতে  প্রস্তাব করা;
ঘ) কোন পন্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন  দ্বারা ক্রেতা সাধারনকে প্রভাবিত করা;
(চ) কোন পন্য সরবরাহ বা বিক্রয়ের  সময় ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপো কম ওজনে বিক্রয় বা সর্বরাহ করা;  ও
(ছ) কোন পন্য বিক্রয় বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ওজন পরিমাপের কাজে ব্যবহত  বাটখারা বা ওজন পরিমাপের যন্ত্র প্রকৃত ওজন অপো অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শন কারী হওয়া  ইত্যাদি।
এই আইনের  ৮ ধারায় বলা আছে যে, ভোক্তা অধিকার সংরন পরিষদ এর কার্য হবে এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রয়োজনীয় বিধান মালা প্রনয়ন ; ভোক্তা অধিকার সর্ম্পকে জনসাধারনকে সচেতন করার ল্েয প্রয়োজনীয় শিা ও প্রচারনা মূলক কার্যক্রম গ্রহন করা ইত্যাদি।  কিন্তু এর কোন বাস্তব প্রতিফলন না থাকায় এধরনের যে একটি আইন আছে তা এখনও অনেকই জানে না। ভোক্তা অধিকার সংরন  আইনে অভিযুক্ত কয়েকটি অপরাধের শাস্তির বিধান নিম্নে দেয়া হলোঃ 
এই আইনের ৪০ ধারা মোতাবেক কোন ব্যক্তি কোন আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপো অধিক মূল্যে কোন পন্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় করলে বা করার প্রস্তাব তিনি অনুর্ধ্ব এক বৎসর কারাদ›ন্ড,বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।
এই আইনের ৪১ ধারা মোতাবেক কোন ব্যক্তি জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পন্য বা ঔষধ বিক্রয় করলে বা করার প্রস্তাব তিনি অনুর্দ্ধ তিন বৎসর কারাদ›ন্ড, বা অনধিক দুই ল টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।
এই আইনের ৪৭ ধারা মোতাবেক কোন পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে কোন  ব্যক্তি দোকান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ওজন পরিমাপের কাজে ব্যবহত বাটখারা বা ওজন পরিমাপ যন্ত্র  প্রকৃত অপো অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শনকারী হলে তিনি অনুর্ধ্ব এক বৎসর কারাদ›ন্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার অর্থদন্ড,বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।
আইনে শাস্তির এত কঠোর বিধান থাকা সত্ত্বেও দুর্বল প্রয়োগের কারনে  দ্রব্যমুল্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, এর অন্যতম কারন এক শ্রেনীর ব্যবসায়ী অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ী জনগোষ্ঠী। যার ফলে দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি ঠেকাতে সকল  চেষ্টা হচ্ছে। এটা আমাদের দেশের একটা কালচারে পরিনত হয়েছে, কোন পণ্যের দাম বাড়লে সেটা বর্হিবিশ্বে কমলেও আমাদের দেশে আর কমে না। প্রতি বৎসর বাজেট পাশের সাথে সাথে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির একটা হিড়িক পড়ে যায়। এতে দেখা যায় বাজেটে যে পণ্যটির দাম বাড়েনি সেটিও বেশি দামে বিক্রি শুরু হয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের এই ধরনের মানসিকতার পরিবর্তন ও দ্রব্যমুল্যের উর্ধ্বগতি ঠেকাতে দরকার আইনের কঠোর প্রয়োগ। এেেত্র কিছু ব্যবসায়ী জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারের জনপ্রিয়তা কমলেও দেশের বৃহৎ জনসাধারন এতে উপকৃত হবে এবং সরকারের জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধিপাবে। কারন দ্রব্যমুল্যের উর্ধ্বগতি ঠেকাতে না পারলে দেশকে দুঃর্নীতি মুক্ত করার প্রতিশ্র“তির ব্যর্থয় ঘটবে। তাই দেশের বৃহৎ জনসাধানের স্বার্থে এই আইনটির যথাযর্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি রোধ করা  সময়ের দাবী। 
লেখক : আইন বিভাগ, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়
ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রাম।

জুনোসিস মানব স্বাস্থ্যের জন্য একটি বিরাট ঝুঁকি -আবু সালেহ

আদিকাল থেকেই মানব জাতি নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে আসছে। সাইকোন, হারিকেন থেকে শুরু করে আজকের দিনের রিটা ক্যাটরিনা, সুনামি, সিডর, নার্গিস কিংবা আইলা,কোনটিই বাদ যায়নি। এ ছাড়াও মাঝে মধ্যে নানা অজানা এবং মারাত্মক সব রোগ জীবানু মানব জাতিকে বিশেষ ভাবে ভাবিয়ে তোলে। বিশেষ করে এইডস, সার্স, বার্ড-ফু, সোয়াইন-ফু, নিপাই ভাইরাস তেমনি কিছু রোগ বালাই যা মানুষকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। জুনোসিস শব্দটি (তড়ড়+এৎববশ হড়ংড়ং  ফরংবধংব) গ্রীক ভাষা থেকে  এসেছে যার অর্থ প্রাণীর রোগ বালাই। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলা যায, যে সব রোগ কোন মেরুদন্ডী প্রাণীদেহ থেকে মানুষের মধ্যে স্থানান্তরিত হয় তাকে জুনোটিক রোগ বলে। এবং এই প্রক্রিয়াটিকে বলে জুনোসিস। সম্প্রতি দেশে অ্যানথ্রাক্স ও নিপাই ভাইরাস ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যা মূলত: জুনোটিক রোগের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এর পূর্বে সার্স, বার্ড-ফু, সোয়াইন-ফু, ইত্যাদি জুনোটিক রোগ পৃথিবী ব্যাপী মানুষকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। তবে জুনোটিক রোগের জীবানু বেশীর ভাগই ভাইরাস জাতীয়। ফলে প্রত্যেকটি রোগের েেত্র ফলাফল অত্যন্ত প্রকট হয়ে থাকে। ভাইরাস সনাক্তকরণে জটিলতা এবং আক্রমণ কারী ভাইরাসের প্রতিষেধক  না থাকার কারণে  পশু-পাখি এবং মানুষের ভয়াবহ য়তির সম্ভাবনা তৈরী হয়। আরেকটি বিষয় হলো ভাইরাস পোষক দেহে অতি দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে  কিংবা দৈহিক সংস্পর্শে কাছাকাছি বা গাদাগাদি হয়ে বাস করা প্রাণীর মধ্যে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। দৈনিক পত্রিকার পাতায় প্রায়ই খবর বের হচ্ছে অজ্ঞাত
রোগে একই পরিবারে পাঁচ জনের প্রাণহানি। এই অজ্ঞাত  রোগটি আমাদের দেশে প্রায়ই অজ্ঞাত থাকে। ধারণা করা হয়, বন্যপ্রাণীর কোন অজানা ভাইরাস কোন খাবারের মাধ্যমে হয়ত তারা গ্রহণ করেছেন। যেমন এটি হতে পারে গ্রামাঞ্চলে শীতের সকালে খেজুরের কাঁচা রস পান করার মাধ্যমে কিংবা বাঁদুড়  কর্তৃক আধা খাওয়া কোন পেয়ারা বা কলার   অবশিষ্টাংশ ভণের মাধ্যমে। শীতকালে আমাদের দেশে খেজুরের রস পানের বিশেষ প্রচলন আছে। মানুষের  পাশাপাশি বাঁদুড়ও রাতের বেলা গাছে ঝুলানো হাঁড়ির মধ্যে থেকে রস খেয়ে থাকে। কখন বা বাদুর কচি ডাব ছিদ্র করে তার পানি  পান করে। এ সময় অন্য  ডাবের গায়েও এই পানি লেগে যায়। অন্যদিকে এই বাঁদুড় প্রজাতিরা নিপাই ভাইরাস বহন করে। ফলে এরা রস পানের সময় নিপাই ভাইরাসটিও হাঁড়ির রসের সাথে মিশে যায়, সকালে যখন বাড়ির সবাই মহা ধুমধামে ঠান্ডা কাঁচা রস পান করে কিংবা ভতি ডাবের বা অন্য কোন ফলের সাথে ভাল ফল লেগে থাকলে  সেই ফল ভালভাবে না ধুয়ে খেলে তখনই দেহে প্রবেশ করে নিরব ঘাতক নিপাই ভাইরাস। সাম্প্রতিক কালে জুনোটিক রোগ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ বেশ বেড়েছে। তার অন্যতম কারণ হলো এসব রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া। ১৯৯৯ সালে নীল ভাইরাস নিউইয়ার্ক সিটিতে ছড়িয়ে পড়ে যেটি ২০০২ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেখা গেছে। অন্যদিকে বিশ্বের  সবচেয়ে ভয়ংকর  মরণ ঘাতক ব্যাধি এইডস্  ও এক প্রকার জুনোটিক রোগ বলে বিজ্ঞানীগণ অভিমত দিয়েছেন। তাদের মতে এক ধরণের লেজ বিহীন বন্য বানরের সাথে কিছু চরিত্রহীন মানুষ তাদের জৈবিক চাহিদা  চরিতার্থ করে। পরে ঐ সব মানুষ আবার সভ্য মানুষের সাথে কিংবা পতিতালয়ে গমনাগমনের মাধ্যমে এইচ.আই.ভি. ভাইরাসটি বিস্তার লাভ করে।
বিজ্ঞানী উধংুধশ বঃ ধষ(২০০১) বলেন, নতুন নতুন জুনোটিক রোগের আবির্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বন্যপ্রাণী এবং মানুষের মধ্যে পরস্পরের কাছাকাছি আসার প্রবণতা সাম্প্রতিক কালে ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবেশের ব্যাপক  পরিবর্তনের জন্য মানুষ বন্য প্রানীর আবাস স্থলে যাতায়াত অথবা  মানুষের আবাস স্থলে বন্যপ্রানীর গমনাগমনের মাধ্যমে এ সম্পর্ক আরো গাঢ়  হয়েছে। ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় নিপাই ভাইরাস (ঘরঢ়ধয ারৎধং) এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এটি ঘটে যখন শুকরের ব্যাপক ফার্মিং এর কারণে শুকররা নিপাই ভাইরাস বহনকারী ফলভোগী বাঁদুর প্রজাপতির প্রাকৃতিক আবাস স্থলে ঢুকে পড়ে। এবং পরবর্তীতে বাদুড়ের দেহ থেকে শুকর এবং শুকরের দেহ থেকে মানুষে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাসটি । সে সময় ১০৫ জন কৃষক নিপাই ভাইরাসের আক্রমণে মারা যায়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে  নিপাই ভাইরাসের উৎপাত  ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত (১৮-০২-২০১১) ২৫ জন লোক মারা গেছে নিপাই ভাইরাসের আক্রমণে। তাই সময় এসেছে  এসব রোগের সংক্রামণ থেকে সকল মানুষের মধ্যে  গণ-সচেতনতা তৈরী করার। এ ব্যাপারে দেশের গণ মাধ্যম তথা রেডিও, টেলিভিশন, পত্রপত্রিকা, পোস্টারিং ও লিফলেট  বিতরণের মাধ্যমে  পৃথিবীবাসীকে সচেতন করে তোলাই সূধীজনের তথা সুশীল সমাজের কিংবা প্রত্যেকটি মানুষের কাজ।
ঠেকাই জুনোসিস, বাঁচাই দেশ;
আসতে পারে শান্তির আবেশ।
এম. এসসি. (ফিশারিজ) প্রথম শ্রেণী,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।